ঢাকার শিশুরা দিনে ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

· Prothom Alo

রাজধানীর একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে মেয়েটি (১৩)। কর্মজীবী মা–বাবার সঙ্গে থাকে কলাবাগান এলাকায়। মেয়েটি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে অন্তত দুই ঘণ্টা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে সময় কাটায়। স্কুল থেকে ফেরার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত সে মুঠোফোন স্ক্রিনে চোখ রাখে অন্তত চার ঘণ্টা। ছুটির দিনে এই কাজে সে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে। তার প্রায়ই মাথাব্যথা হয়। চোখও ব্যথা করে। সে এখন চশমা পরে। মুঠোফোন নিয়ে পড়ে থাকা মেয়েটি পড়াশোনায় অমনোযোগী। মেয়েকে মুঠোফোন থেকে দূরে রাখার উপায় নিয়ে মা–বাবা চিন্তিত। তাঁরা এখন মেয়েকে একটি বিড়াল পুষতে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

Visit palladian.co.za for more information.

এই মেয়েটির মতো ঢাকার অনেক শিশুই মুঠোফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে। মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে খারাপ প্রভাব। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে কাটায়।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০টি শিশুর ওপর গবেষণাটি করা হয়। স্কুলগুলোর মধ্যে তিনটি বাংলা মাধ্যম, তিনটি ইংরেজি মাধ্যমের। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার আইসিডিডিআরবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, মা–বাবার উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা না করা। কারণ, এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে, যা তাঁদের সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

আইসিডিডিআরবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গবেষকেরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা করেছেন। বিভিন্ন বিষয় জানতে গবেষকেরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু সহজ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে গবেষকেরা দেখেছেন, শিশুরা কত সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা ঠিকমতো ঘুমায় কি না, তাদের ওজন স্বাভাবিক কি না, তাদের আচরণ বা মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো সমস্যা আছে কি না।

প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিশুদের ঘুম, আচরণ ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারটি শিশু (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে। এটি শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় কাটায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে। আর ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই ভুগছে মাথাব্যথায়। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ঘুমায়। এই বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় তা অনেক কম। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার। যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার বেশি।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে দুটি শিশু দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বিভিন্নভাবে শিশুদের ক্ষতি করতে পারে। রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত সময় স্ক্রিন ব্যবহার চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা ও মনোযোগ কমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের অন্যদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা কমে যায়, যা তাদের মনমেজাজ, অনুভূতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উদ্বেগ ও পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা শিশুদের চোখের যত্নে ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে।

গবেষকেরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং শিশুদের বাড়িতে, স্কুলে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অদৃশ্য মহামারি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপমূলক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়।

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য তাদের বাইরের খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ডিজিটাল ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করা। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

Read full story at source