বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক দশকে ২০ প্রস্তাব, বাস্তবায়নে বাধা কোথায়

· Prothom Alo

চট্টগ্রাম নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় জাপানের প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং। তাদের মতে, ১ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এ জন্য সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

Visit sport-tr.bet for more information.

বিদ্যুৎ উৎপাদনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে এমন প্রস্তাব জমা পড়া নতুন নয়। গত এক দশকে দেশি-বিদেশি অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু একটি প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক প্রস্তাব দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এ ছাড়া জমির সংকট, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবেশদূষণের শঙ্কাও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।

তবে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তা–ও স্পষ্ট নয়। আবার প্রকল্প অনুমোদনে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২৫-২৬ টাকা পড়ে, সেখানে সরকার গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনছে প্রায় ১২ টাকায়। ফলে এই ধরনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে তেমন লাভজনক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) ওপর চাপ কমবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন ২ হাজার ২৬৯ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে।

এক দশকে ২০ প্রস্তাব

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরের বর্জ্য থেকে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এই প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা এখন পর্যন্ত অনুমোদিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) ওপর চাপ কমবে।

২০২৩ সালের জুনে চীনের প্রতিষ্ঠান সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি বর্জ্য থেকে ৩০-৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে নগরের চর বাকলিয়ায় ৩৫ একর জমি দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছিল সিটি করপোরেশন। তবে পরিবেশদূষণের শঙ্কায় সিটি করপোরেশনের সে আবেদন বাতিল করে মন্ত্রণালয়। ওখানেই থমকে যায় ওই প্রস্তাব।

এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিল চীনের আরেক কোম্পানি পাওয়ার চায়না। এ জন্য সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে ১০ একর জায়গা এবং প্রতিদিন দেড় হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। তবে তা–ও আলোর মুখ দেখেনি।

প্লস্টিকসহ নানা বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে নগরের একটি খাল। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন খালটি পরিষ্কার করলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার বর্জ্যে সয়লাব হয়ে যায়

এই তিন প্রতিষ্ঠান ছাড়া গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড, টেকনিস রিউনিডাস আলফানার অ্যান্ড সিইইজি ইম্প্যাক্ট এনার্জি, স্যাটারাম ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-জয়েন্ট ভেঞ্চার, অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড, গ্রিন পাওয়ার লিমিটেড, সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি, স্কলার্স পাওয়ার লিমিটেড, ডঙ্গুয়ান কিউই রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।

এ ছাড়া প্রস্তাব জমা দিয়েছিল লিড অ্যান্ড ইপিসি পার্টনার ও এসডিআইসি পাওয়ার হোল্ডিং কোং লিমিটেড, এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড, সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, কনসোর্টিয়াম অব সিএনটিআই এলওয়াইজেড, নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড, গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক এবং কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬ থেকে ৩৫ একর জমি এবং এক থেকে আড়াই হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল।

সম্ভাবনা আছে, বলছে সমীক্ষা

জাপানের প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং জাপান সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় চট্টগ্রাম নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে সমীক্ষা করেছে। সমীক্ষার তথ্য-উপাত্ত গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিটি করপোরেশনের কাছে উপস্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নগরে উৎপাদিত বর্জ্যের অর্ধেক, অর্থাৎ এক হাজার টন বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যাবে। এই বর্জ্য দিয়ে ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরের ল্যান্ডফিলে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে এবং এর ফলে ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়বে এবং পরিবেশদূষণ হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি লাভজনক হওয়ার কথা বলা হয় সমীক্ষায়।

যে কারণে আটকে যাচ্ছে প্রস্তাব

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও উদ্যোগ নিয়েছিল। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তৎপর ছিল। ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল পিডিবি। দৈনিক আড়াই হাজার টন বর্জ্য সরবরাহ এবং কেন্দ্রের জন্য বিনা মূল্যে জমি দেওয়ার কথা ছিল সিটি করপোরেশনের। তবে ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য ২৫ একর জমির প্রয়োজন থাকলেও সিটি করপোরেশন তা দিতে পারেনি। ফলে এই প্রস্তাবও থমকে গিয়েছিল।

জমির সংকট ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২৫-২৬ টাকা পড়ে, সেখানে সরকার গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনছে প্রায় ১২ টাকায়। ফলে এ ধরনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে তেমন লাভজনক নয়। তিনি বলেন, এ ছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যুক্ত থাকায় পুরো প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন প্রকৌশলী গোলাম সারওয়ার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, তার বেশির ভাগ অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত। সুনির্দিষ্ট ও পরিপূর্ণ প্রস্তাব না পাওয়ায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প আটকে আছে।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী দেলওয়ার হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে। আর প্রথমে বিদেশি অর্থায়নে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি সফল হয়, তাহলে সরকার তা চালু রাখতে পারে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অবশ্যই সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।

Read full story at source