করহার বৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন কর ফাঁকি রোধ

· Prothom Alo

যাঁরাই বাংলাদেশের উন্নয়ন, বাজেট বা জন-অর্থায়ন নিয়ে খবর রাখেন কিংবা এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক, বিশেষ করে আইএমএফের বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা শুনেছেন বা খবর পড়েছেন, তাঁরাই জানেন বাংলাদেশের অতি দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতি বা কর-জিডিপি হারের দৈন্যদশা। হতাশাব্যঞ্জক রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির কারণে আমাদের উন্নয়ন অর্থায়ন অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে বা সরকারের চাপে আমাদের রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা অনেকটাই ভুল পথে হাঁটছেন বা হাঁটতে পারেন বলেই অনেকের ধারণা।

আমাদের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ের উচ্চ ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্যসংকট—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ‘গোদের উপর বিষফোড়া’র মতো করনীতির অসামঞ্জস্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। করপোরেট করহার ধাপে ধাপে কমিয়ে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামানো হলেও বাস্তবে মোট করভার এখনো ৪০ শতাংশের বেশি, যা বিনিয়োগবান্ধব তো নয়ই; বরং নিরুৎসাহী।

Visit sportbet.reviews for more information.

প্রায় প্রতিবছরই প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় রাজস্ব কর্তৃপক্ষ অংশীজনদের ডেকে কথা শোনেন, কিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু পরিশেষে সেই প্রতিশ্রুতির খুব একটা প্রতিফলন দেখা যায় না।

এ অবস্থায় সরকার যদি নতুন করে টার্নওভার বা লেনদেন কর বাড়ানোর পথে হাঁটে, তবে তা হবে পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলার সমতুল্য। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এতে মূলধনে টান পড়বে, মুনাফা কমবে এবং নতুন বিনিয়োগ আরও কমে যাবে। পণ্য বিতরণ ব্যবসাসহ এসএমই খাতে এমন অনেক ব্যবসা রয়েছে, যাদের উচ্চ ব্যবসায়িক খরচ বা তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ১ শতাংশ নিট মুনাফা করা প্রায় অসম্ভব। অর্থনীতির এই মৌলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফলই বয়ে আনতে পারে। 

জন-অর্থায়নের পাঠ প্রমাণ করেছে—করের হার সহনীয় হলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান বাড়ে এবং দীর্ঘ মেয়াদে রাজস্বও বৃদ্ধি পায়। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অনেক ক্ষেত্রেই ভোক্তা ও ব্যবসা—উভয়ের জন্যই চাপ সৃষ্টি করছে। সন্দেহ নেই, উচ্চ হার দিয়ে সীমিত করদাতার ওপর চাপ সৃষ্টি করার বদলে, কম হার দিয়ে করের আওতা বৃদ্ধি অধিক কার্যকর এবং ভবিষ্যতে ফলদায়ক হবে।

সম্পদ কর আদায় বাড়াতে হবে

আমাদের করনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। দেশে এক কোটির বেশি টিআইএনধারী থাকলেও অর্ধেকের কম মানুষ আয়কর রিটার্ন জমা দেন। তার থেকেও অনেক কম লোক কর দেন। এটি শুধু করভীতি নয়; বরং আস্থার সংকটেরও প্রতিফলন।

কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা, টিআইএন ও এনআইডি ডেটাবেজ একীভূত করা এবং নতুন ব্যক্তি করদাতাদের জন্য প্রতীকী ন্যূনতম কর চালু করার মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, এটা খোদ রাজস্ব বিভাগেরও অনেকের ধারণা। তাঁরা এটাও মনে করেন, ডেটাবেজ একীভূত করা গেলে স্থায়ী আমানত বা সঞ্চয়পত্র থেকে যে ১০ শতাংশ আগাম কর কর্তন করা হয়, তাদের থেকে পরিশেষে স্ল্যাব বা কর স্তর অনুযায়ী বাকি করও আদায় করা সম্ভব।

এ ছাড়া করকাঠামোর মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা দূর করাও জরুরি। একদিকে করপোরেট কর কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, অন্যদিকে নানা শর্ত ও পরোক্ষ কর বা কর নির্ধারণে জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত সুবিধা পান না। নগদ লেনদেনের কঠোর শর্ত, উচ্চ আমদানি শুল্ক, উৎসে কর—সব মিলিয়ে কার্যকর করভার অনেক বেড়ে যায়। ফলে ঘোষিত করহারের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক তৈরি হয়। অন্যদিকে রয়েছে ব্যাপক কর অব্যাহতির রেকর্ড। 

রপ্তানি খাতের দুরবস্থাও এই করনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। গেল ৯ মাসে রপ্তানি কমছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে উৎসে কর কমানো এবং কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস করা জরুরি। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও করনীতি পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিন বা বাচ্চাদের ডায়াপারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্য সমস্যাও সৃষ্টি করছে।

এ ধরনের পণ্যে করছাড় বা হ্রাস সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে অন্য অনেক অতিপ্রয়োজনীয় খাত বা উপখাত নিয়েও ভাবা যেতে পারে, যেখানে খুব একটা কর আদায়ের সম্ভাবনা নেই; কিন্তু অব্যাহতি বিরাট সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে নতুন করে কর আদায়ের জন্য অন্য অনেক প্রতিযোগী দেশের মতো বাণিজ্যিক কৃষির কথা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এমনকি বিনিয়োগের স্বার্থে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে করের পার্থক্যের বিষয়েও ভেবে দেখা যেতে পারে। রেকর্ড বলে, বিদেশি কোম্পানির কর প্রদানের ইতিহাস ভালো এবং তাদের উৎসাহিত করলে বিনিয়োগ বাড়বে।

আসন্ন জাতীয় বাজেট তাই শুধু রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি উপলক্ষ হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির রূপরেখা। শাস্তিমূলক নয়, সহায়ক করনীতি প্রণয়নই পারে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি আনতে। আমাদের রাজস্ব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে প্রচলিত কিংবা ঐতিহাসিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে অপরাপর প্রতিযোগী দেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বা অভিজ্ঞতার আলোকে আবদ্ধ চিন্তা বা বাক্সের বাইরে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। 

প্রায় প্রতিবছরই প্রাক্‌বাজেট আলোচনায় রাজস্ব কর্তৃপক্ষ অংশীজনদের ডেকে কথা শোনে, কিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়; কিন্তু পরিশেষে সেই প্রতিশ্রুতির খুব একটা প্রতিফলন দেখা যায় না। যাঁরা কর দেন, তাঁদের ওপরই নতুন কর চেপে বসে বা কর প্রদান পদ্ধতি আরও জটিল ও পীড়াদায়ক করে ফেলা হয়। আর দরিদ্রদের ওপর চেপে বসে পরোক্ষ করের বোঝা। আমরা অবশ্যই এর পরিবর্তন চাই। চাই কর ফাঁকি রোধ আর কর খাতের সম্প্রসারণ।

মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

Read full story at source