অস্ট্রেলিয়ার কথা বলে নেপালে নিয়ে নির্যাতন, ৮ মাস পর বাড়ি ফিরলেন সাকিব

· Prothom Alo

ছেলে সাকিব হোসেনকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাতে দালালের হাতে ১৫ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন (৪৪)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বদলে তাঁকে নেপালে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখা হয়। এর পর থেকে ছেলের খোঁজ পাচ্ছিলেন না আলগমীর। প্রায় আট মাস পর বাড়ি ফিরে সাকিব হোসেন শোনালেন ভয়াবহ এক বন্দিজীবনের গল্প। জানালেন, নেপালের একটি কক্ষে আটকে রেখে প্রতিদিন মারধর, ছুরি দেখিয়ে ভয় দেখানো, এমনকি পেটে আঘাত করার মতো নির্মম নির্যাতনের কথা।

Visit mchezo.life for more information.

সাকিবদের (২১) বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামে। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে নেপালের কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুদিন পর থেকেই তাঁর খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। গত শনিবার রাতে তিনি অবৈধ পথে ভারত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

নেপাল গিয়ে সাকিবের নিখোঁজ থাকা নিয়ে গত ১৬ এপ্রিল প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে ‘অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার কথা বলে নেওয়া হয় নেপালে, তরুণের খোঁজ পাচ্ছেন না মা-বাবা’ শিরোনোমে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এর আগে ছেলেকে ফিরে পেতে আলমগীর হোসেন গত ১৬ ফেব্রুয়ারি যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এ মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করেন। মামলায় উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের মোকলেস মোল্যার ছেলে তরিকুল ইসলাম (৪৫) এবং নাজমুল হোসেনকে (৩৫) আসামি করা হয়েছে।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা বাঘারপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোবিন্দ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘সাকিব হোসেন দেশে ফিরে এসেছেন। মামলার আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

গত রোববার (৩ মে) দুপুরে কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে কথা হয় সাকিব হোসেনের সঙ্গে। এ সময় তাঁকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। কথা বলার সময় বারবার তিনি দুচোখ মুছছিলেন।

ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন, সাকিব হোসেনের বাবাছেলেকে ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। কিন্তু পাওনাদারেরা টাকার জন্য প্রতিদিন বাড়ি এসে বসে থাকছে। কী খাব আর কী করে টাকা পরিশোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

সাকিব হোসেন জানান, ঢাকায় বিমানবন্দরে তাঁরা পাঁচজন ছিলেন। এর মধ্যে একজন দালালের লোক। পাসপোর্ট ছিল দালালের লোকের কাছে। তিনি জানতেন, তিনি অস্ট্রেলিয়াতে যাচ্ছেন। বিমান অবতরণের পর দেখতে পান তিনি নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে। তিনি আবাক হন। সেখানে পাসপোর্ট ফিরে পেয়ে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করে বিমানবন্দরের বাইরে এলে দালালের লোক তাঁর পাসপোর্ট এবং কাছে থাকা আশি হাজার টাকা মূল্যের ডলার নিয়ে নেন। তিনজনকে বিমানবন্দরের বাইরে রেখে দালালের লোক তাঁকে নিয়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় যান। দুই দিন পর অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইট। দুইজন বাঙালি এসে তাঁকে নিয়ে যাবেন বলে দালালের লোক চলে যান। প্রায় আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর দুইজন লোক এসে তাঁকে নর্থ বেঙ্গল হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলে যাওয়ার আগে তাঁরা তাঁর মোবাইল নিয়ে নেন।

সাকিব জানান, হোটেলের একটি কক্ষে তিনটি বেড (শয্যা)। তিনজন ওই কক্ষে থাকতেন। তাঁরা তাঁকে বাইরে বের হতে দিতেন না। দালালের লোকজন বাইরে বের হলে তাঁকে ভেতরে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেতেন।

টাকার জন্য প্রতিদিন তাঁকে মারধর করা হতো উল্লেখ করে সাকিব হোসেন বলেন, বাড়ি থেকে কথা বলার জন্য কল করলে তাঁরা ফোন দিতেন। তাঁরা যা বলে দিতেন, বাড়িতে তাই বলতে হতো। কথা বলার সময় তাঁরা পাশে ছুরি নিয়ে বসে থাকতেন। তাঁদের শেখানো কথা না বললে ছুরি দিয়ে ভয় দেখাতেন। তাঁরা আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। ওই টাকা নেওয়ার পরও তাঁরা তাঁকে মারধর করতেন।

অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার কথা বলে নেওয়া হয় নেপালে, তরুণের খোঁজ পাচ্ছেন না মা–বাবা

চার মাস সেখানে থাকার পর নতুন দুজন লোক এসে তাঁকে ট্যাক্সিতে করে একটি নির্জন জায়গার ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যান বলে জানান সাকিব হোসেন। এরপর বাড়ির বেজমেন্টের ঘরে তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়। ঘরে আলো–বাতাস ঢোকার অল্প জায়গা আছে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর তাঁকে ভাত খেতে দেওয়া হয়। ওই ঘরে প্রতিদিন তাঁকে মারধর করা হতো। ভাত খেতে চাইলেও মারধর করা হতো। তাঁরা ছুরি নিয়ে বসে থাকতেন। একদিন মারধর করার সময় তাঁরা তাঁর পেটে ছুরি দিয়ে পোঁচ দেন। এতে তিনি মারাত্মক আহত হন। অবশ্য শেষের ১৫ দিন তাঁরা মারধর করেননি।

বাড়িতে ফিরে আসার বর্ণনা দিয়ে সাকিব জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁরা দুজন তাঁকে নিয়ে বের হন। বাসে করে প্রথমে ভারতের শিলিগুড়ি নিয়ে আসেন। সেখানে বাস পরিবর্তন করে পরদিন দুপুরে জলপাইগুড়িতে আসেন। সেখান থেকে অটোতে করে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে সেখানে তাঁকে রেখে দুইজন লোক চলে যান। নতুন একজন এসে তাঁকে নিয়ে পায়ে হেঁটে একটি ফাঁকা মাঠের মধ্যে রেখে চলে যান। এরপর নতুন একজন লোক এসে তাঁকে নিয়ে প্রায় শুকনো একটি নদী হেঁটে পার হয়ে এপারে আসেন। শুক্রবার শেষ রাতের দিকে তাঁকে নিয়ে তারকাঁটার নিচে কালভার্টের ভেতর দিয়ে পার করে নীলফামারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি চলে যান। সেখান থেকে শনিবার রাতে তিনি ট্রেনে করে বাড়ি ফিরেছেন।

সাকিব হোসেন বলেন, ‘শরীর খুব দুর্বল। ওজন অনেক কমে গেছে। কিছু ভালো লাগে না।’

ছেলেকে ফিরে পেয়ে খুশি সাকিবের মা সোনালী বেগম (৩৮)। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দ লাগছে। কিন্তু দেনার যন্ত্রণা নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’

ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে সহায়–সম্পদ সব বিক্রি করে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন বলে জানালেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ২২ শতক জমি ছিল। এর মধ্যে ১৪ শতক ভিটাবাড়ি এবং ৮ শতক জমিতে লিচুবাগান। ইঞ্জিনচালিত একটি ভ্যান ছিল। মাথা গোঁজার জমিটুকু ছাড়া সব জমি বিক্রি করেছি। আয়ের একমাত্র সম্বল ভ্যানটিও বিক্রি করে দিয়েছি। পাঁচটি এনজিও ও সমিতি থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোন নিয়েছি। ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে সংসারে একটু সচ্ছলতা আনার জন্য সব টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়েছি।’  

এখন আয়ের কোনো পথ খোলা নেই উল্লেখ করে আলগমীর হোসেন বলেন, ‘ছেলেকে ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। কিন্তু পাওনাদারেরা টাকার জন্য প্রতিদিন বাড়ি এসে বসে থাকছে। কী খাব আর কী করে টাকা পরিশোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

Read full story at source