ট্রাম্পকে বারবার কেন হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে

· Prothom Alo

শনিবার রাতে (২৫ এপ্রিল) ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আরেকটি চেষ্টা চালানো হয়েছে। গত দুই বছরে এটি তাঁর ওপর এ ধরনের তৃতীয় আক্রমণ। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারের এক নির্বাচনী জনসভায়, যেখানে ট্রাম্প সামান্য আহত হন।

Visit sportfeeds.autos for more information.

দ্বিতীয় চেষ্টাটি হয়েছিল মার-এ-লাগো রিসোর্টে, যেখানে আততায়ী লক্ষ্যভেদের আগেই ধরা পড়ে। আর সবশেষ এই হামলা হলো ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রটি আরও দীর্ঘ। গত গ্রীষ্মে মিনেসোটা হাউসের সাবেক স্পিকার মেলিসা হর্টম্যান ও তাঁর স্বামী নিহত হন। সেই বছরের শেষের দিকে ইউটাতে এক অনুষ্ঠানে উগ্র ডানপন্থী সংগঠন ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চার্লি কার্কও হত্যার শিকার হন।

প্রত্যাশিতভাবেই শনিবারের ঘটনার পর ট্রাম্পের সহযোগীরা অবিলম্বে এই হামলার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করতে শুরু করেছেন।

সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট বলেন যে প্রেসিডেন্টের পরিবার এবং তাঁর সমর্থকদের নিয়ে ছড়ানো মিথ্যা ও অপবাদ উন্মাদদের বিপথে চালিত করছে। তিনি মনে করেন, প্রতিপক্ষের বক্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ওই ব্যক্তিরা (হামলাকারীরা) সহিংস হয়ে উঠছে। ট্রাম্প নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে ডেমোক্র্যাটদের ছড়ানো বিদ্বেষমূলক কথা দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ট্রাম্প হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছেন না, কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরের এই ধারাবাহিক সহিংসতার ভাষা আমেরিকান সমাজে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। এটা ঠিক যে আমেরিকায় রাজনৈতিক সহিংসতা আগেও ছিল। তবে আশির দশকের পর থেকে এটি কমতে শুরু করেছিল। ট্রাম্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই অন্ধকার যুগ ফিরে আসছে।

রিপাবলিকানদের যুক্তি বেশ সহজ। তাঁদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে যত বেশি আক্রমণ করবেন, কিংবা মার্কিন রাজনীতির জন্য অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করবেন, ট্রাম্পের জীবন ততটাই হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে এই যুক্তির তেমন ভিত্তি পাওয়া যায় না।

গত কয়েক বছরে ডেমোক্র্যাটদের মুখে আমরা যেসব কড়া বক্তব্য শুনেছি, তার সবই মূলত স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চার ভেতরেই পড়ে। তাদের কোনো নির্বাচিত নেতা কখনোই ট্রাম্পের ওপর সহিংসতার ডাক দেননি; বরং যেখানেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তাঁরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

কিন্তু ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক শিবিরের চিত্রটি একেবারেই আলাদা। রিপাবলিকান নেতাদের ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই মারমুখী। উদাহরণ হিসেবে স্টিভ ব্যাননের কথা বলা যায়, যিনি মাঝেমধ্যেই হোয়াইট হাউসের সামনে বিরোধীদের মুণ্ডুপাত করার মতো উসকানিমূলক কথা বলেন। আর ট্রাম্প নিজে তো ২০১৫ সালে রাজনীতিতে আসার পর থেকেই তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতার ভাষা ব্যবহার করছেন।

সন্দেহভাজন কোল টমাস অ্যালেনের ছবিটি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৫ এপ্রিল ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার হয়েছে।

রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক যুদ্ধের আহ্বান জানানো ট্রাম্পের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। প্রথম নির্বাচনের সময় হিলারি ক্লিনটনের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে তিনি অস্ত্রধারীদের উসকে দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে যখন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে লুটতরাজ শুরু হলে গুলিও শুরু হবে।

তিনি সাবেক সেনাপ্রধান মার্ক মিলির মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের তিনি বারবার ‘ক্ষতিকর কীট’ হিসেবে অভিহিত করে এসেছেন। ২০২৪-এর জয়ের প্রাক্কালে তিনি বিরোধী দলগুলোর লোকজনকে ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ বা ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে সামরিক বাহিনী নামানোর কথাও বলেছেন।

এর সঙ্গে রয়েছে ২০২১ সালের ক্যাপিটল হিল আক্রমণের ঘটনা। সমর্থকদের উত্তেজিত করতে সেদিন তিনি বলেছিলেন যে লড়াই না করলে দেশ থাকবে না। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরতে পরতে এমন সহিংস কথার উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের একেকবার একেক কথায় বিভ্রান্ত–বিভক্ত মার্কিন নাগরিকেরা

একসময় রক্ষণশীল নেতারা মনে করতেন যে সমাজে প্রথা ও শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা জরুরি, যাতে অযথা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। আমেরিকার ইতিহাসে পূর্ববর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট এমন আপত্তিকর কথা বলতেন না।

কারণ, তাঁরা জানতেন যে হোয়াইট হাউস থেকে ছুড়ে দেওয়া একটি কথা পুরো দেশে অশান্তির দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্প এই দায়িত্ববোধের পরোয়া করেন না। তিনি শব্দকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। কখনো তিনি আইনপ্রণেতাদের মৃত্যুদণ্ড চান, আবার কখনো কোনো দেশ ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

ট্রাম্প হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছেন না, কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরের এই ধারাবাহিক সহিংসতার ভাষা আমেরিকান সমাজে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। এটা ঠিক যে আমেরিকায় রাজনৈতিক সহিংসতা আগেও ছিল।

তবে আশির দশকের পর থেকে এটি কমতে শুরু করেছিল। ট্রাম্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই অন্ধকার যুগ ফিরে আসছে। এখন মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে যে সহিংসতাই হলো ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র পথ।

নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় বন্দুকধারীর ছোড়া গুলি কানে লাগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মুখে—এ অবস্থায় সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা ট্রাম্পকে সরিয়ে নেন। পেনসিলভানিয়ার বাটলার এলাকায়, ১৩ জুলাই ২০২৪

ট্রাম্পকে মারার যে চেষ্টাগুলো হচ্ছে, তার দায় সরাসরি তাঁর ওপর চাপানো যাবে না ঠিকই, তবে তিনি এমন এক বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে এমন ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, যে কেউ যেকোনো ক্ষোভ থেকে তাঁর ওপর হামলার কথা ভাবতে পারে।

নৈশভোজে হামলার পর ট্রাম্প বলেছিলেন যে নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাঁকে বড় মিলনায়তনে ঘেরা পরিবেশে অনুষ্ঠান করতে হবে। এটি তাঁর আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশ তো বটেই, তবে এর পেছনে লুকানো ভয়কেও অগ্রাহ্য করা যায় না। ট্রাম্প ইদানীং হোয়াইট হাউস বা মার-এ-লাগোর বাইরে খুব একটা বের হতে চান না। তিনি আসলে নিজের তৈরি করা এই ভয়ংকর সমাজকে এখন ভয় পাচ্ছেন, যা তাঁর রাজনীতির একটি বিয়োগান্ত পরিণতি ছাড়া আর কিছু নয়।

  • জেমেলে বুই লেখক ও গবেষক

    নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source