সহিহ হাদিস চিনবেন কীভাবে
· Prothom Alo

ইসলামি জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হলো হাদিস। কোরআনের নির্দেশনাকে বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হাদিসে।
Visit afnews.co.za for more information.
তবে সব হাদিস একই মানের নয়; কিছু সহিহ, কিছু হাসান (সহিহ’র চেয়ে নিম্নমানের হাদিস) আবার কিছু জয়িফ (দুর্বল)। তাই হাদিস যাচাইয়ের একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি প্রাচীনকাল থেকেই হাদিস বিশারদগণ তৈরি করেছেন।
এই আলোচনায় আমরা সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করব, সহিহ হাদিস কী এবং একটি হাদিসকে সহিহ গণ্য করার জন্য কী কী শর্ত অপরিহার্য।
সহিহ হাদিস কী
সহিহ হাদিস হলো এমন হাদিস, যা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং যার মধ্যে কোনো গোপন ত্রুটি বা শক্তিশালী বর্ণনার বিরোধ নেই।
অর্থাৎ, এটি এমন একটি বর্ণনা, যা রাসুল (সা.)-এর কথা, কাজ বা অনুমোদন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ, ১৯-২০)
একটি হাদিসকে সহিহ হিসেবে গণ্য করার জন্য মুহাদ্দিসগণ মৌলিক পাঁচটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এই শর্তগুলো সহিহ হাদিসের উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকেই স্পষ্ট হয়।
সহিহ হাদিসের গুরুত্ব
সহিহ হাদিস ইসলামি জীবনব্যবস্থার একটি মূল ভিত্তি। ইসলামের বিভিন্ন দিক—যেমন আকিদা, ফিকহ ও ইবাদত—এসব ক্ষেত্রেই সহিহ হাদিসের ওপর নির্ভর করা হয়। এগুলো অনুসরণ করলে একজন মুসলমান নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তিনি সঠিক পথে ইসলাম পালন করছেন।
মুহাম্মাদ (সা.) একজন মানুষ রাসুলহাদিস সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্ত
একটি হাদিসকে সহিহ হিসেবে গণ্য করার জন্য মুহাদ্দিসগণ মৌলিক পাঁচটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এই শর্তগুলো সহিহ হাদিসের উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকেই স্পষ্ট হয়। চলুন, ধাপে ধাপে সেগুলো বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
১. সনদের পূর্ণ সংযোগ
হাদিসবিশারদদের মতে, হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো, সনদে পূর্ণ সংযোগ থাকা। সনদ বলতে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক পরম্পরাকে বোঝায়; অর্থাৎ একজন থেকে আরেকজন হয়ে যেভাবে হাদিস আমাদের কাছে পৌঁছেছে সেটিই সনদ। যদি এই সনদে কোনো ছেদ থাকে; অর্থাৎ পরম্পরা ভেঙে যায়, তবে সেটি মুহাদ্দিসদের নিকট ‘জয়িফ’ বলে গণ্য হয়। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ, ৬৬-৬৭)
যদি কোনো রাবি (বর্ণনাকারী) বারবার ভুল করেন বা যার বর্ণনায় প্রায়ই অসঙ্গতি থাকে, তিনি সহিহ হাদিসের রাবি হওয়ার যোগ্য নন।
২. বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা
সহিহ হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত হলো, সনদের প্রত্যেক বর্ণনাকারী (রাবি) ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। এর অর্থ হলো তিনি—
প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিসম্পন্ন হবেন।
ইমানদার ও সৎ চরিত্রের অধিকারী হবেন।
বড় গুনাহ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি ছোট গুনাহে অভ্যস্ত হবেন না।
এমন কোনো কাজ করবেন না, যা তার চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। (জাওয়াবিতুল জারহি ওয়াত তাদিল: ১৮)
৩. স্মরণশক্তি নির্ভুল হওয়া
বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি শক্তিশালী ও নির্ভুল হতে হবে। তিনি যদি মুখস্থ বর্ণনা করেন, তবে তা ভালোভাবে আয়ত্ত থাকতে হবে; আর যদি লিখে সংরক্ষণ করেন, তবে লিখিত তথ্য নির্ভুল হওয়া জরুরি।
এ কারণে মুহাদ্দিসদের মত হলো, যদি কোনো রাবি (বর্ণনাকারী) বারবার ভুল করেন বা যার বর্ণনায় প্রায়ই অসঙ্গতি থাকে, তিনি সহিহ হাদিসের রাবি হওয়ার যোগ্য নন। (জাওয়াবিতুল জারহি ওয়াত তাদিল, ১৯)
খোদা–আসক্তি বাস্তব জীবনকে বর্জন করে না৪. গোপন ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা
হাদিসের সনদ বা মতনে (হাদিসের মূলপাঠে) কখনো এমন সূক্ষ্ম ত্রুটি থাকে, যা সাধারণভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে ধরা পড়ে। একে ‘ইল্লত’ বলা হয়। এই ধরনের ত্রুটি শনাক্ত করা কেবল অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসদের পক্ষেই সম্ভব। অনেক সময় এই ইল্লত হাদিসকে সহিহ হওয়ার পথে বাধা দেয়। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ, ১২০)
যেমন—
মূলপাঠে এমন কোনো বক্তব্য থাকা, যা কোরআন, মুতাওয়াতির হাদিস (ধারাবাহিকসূত্রে বর্ণিত হাদিস) বা ইসলামের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
সনদে এমন দাবি থাকা যে একজন রাবি অন্য রাবি থেকে হাদিস শুনেছেন, অথচ বাস্তবে তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ বা শ্রবণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ: ১২০-১২১)
হাদিস পড়ার সময় শুধু অর্থ জানা যথেষ্ট নয়; বরং তার মান ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।
৫. শক্তিশালী বর্ণনার বিরোধী না হওয়া
কোনো হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য সনদ সহিহ হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, এটি যেন অধিক নির্ভরযোগ্য রাবির বর্ণনার বিরোধী না হয়।
যদি কোনো বিশ্বস্ত রাবির বর্ণনা আরও শক্তিশালী রাবির বর্ণনার বিরোধী হয়, তবে তাকে “শাজ” বলা হয় এবং তা অগ্রহণযোগ্য। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ, ১০৮)
শেষ কথা
সহিহ হাদিস ইসলামি শরিয়তের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এর মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি রাসুল (সা.) কী বলেছেন এবং কীভাবে জীবন পরিচালনা করতে বলেছেন। তাই হাদিস পড়ার সময় শুধু অর্থ জানা যথেষ্ট নয়; বরং তার মান ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক
ইসলামি শরিয়তের প্রধান উৎস কী কী