মব একটি মডেল বা স্ক্রিপ্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে
· Prothom Alo

নুসরাত সাবিনা চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামহার্স্ট কলেজের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তিনি গণতন্ত্র, রাজনৈতিক চর্চার বিভিন্ন ধারা এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় মব সহিংসতা নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে মব সহিংসতা এবং এর সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম
Visit extonnews.click for more information.
মব সহিংসতা বাংলাদেশে আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এটা প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
নুসরাত চৌধুরী: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে এবং দীর্ঘদিনের একক রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের ‘ফাঁকা মাঠ’ বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন গোষ্ঠী, সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের উপস্থিতি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করে। এর ফলে একটি অস্থিরতা ও অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে মবকে যদি অরাজকতার একটি এজেন্ট হিসেবে দেখি, তাহলে গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ধরনের প্রবণতা নতুন নয়; বরং এটি অন্যান্য দেশেও দেখা গেছে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা প্রবণতা হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আংশিকভাবে অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। আগে আমরা যেসব ঘটনাকে উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা গণপিটুনি হিসেবে চিহ্নিত করতাম, এখন সেগুলো ক্রমেই মব সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে। মব শব্দটির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে সহিংসতার বর্ণনা—দুটিই আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
মব সহিংসতায় অংশগ্রহণকারীরা কি কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন?
নুসরাত চৌধুরী: মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যা ক্রাউড সাইকোলজি নামে পরিচিত। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিভিন্ন তাত্ত্বিক মব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দিয়েছেন। এই তত্ত্বগুলো মূলত ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতা এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী ইউরোপীয় সমাজের সহিংসতার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। তাঁদের মতে, ব্যক্তি যখন জনতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার ব্যক্তিগত বোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমে যায় এবং একধরনের ‘রিগ্রেশন’ বা মানসিক পশ্চাদপসরণ ঘটে।
তবে এ ধরনের তত্ত্বের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, এগুলোর মধ্যে একটি এলিটিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে, যেখানে সাধারণ মানুষকে অযৌক্তিক বা সহজেই প্রভাবিত হিসেবে দেখা হয়। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব উপেক্ষা করে আচরণকে জৈবিক বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চায়। ফলে এই তত্ত্বগুলো অনেক সময় মব বা জনতার অংশগ্রহণকারীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে অস্বীকার করে এবং বিষয়টিকে অতিমাত্রায় সরলীকৃত করে ফেলে।
আমার দৃষ্টিতে মব সহিংসতাকে কেবল মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রয়েছে সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাই অংশগ্রহণকারীদের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ করে দেখা কঠিন। সার্বিকভাবে বলা যায়, মব সহিংসতা বোঝার জন্য মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মব কি প্রচলিত রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে আলাদা কোনো ফেনোমেনা? এটা কি কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে?
নুসরাত চৌধুরী: এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই মব বলতে আমরা কী বুঝি, সেটি পরিষ্কার করা জরুরি। আমরা প্রায়ই এই শব্দ ব্যবহার করি, কিন্তু সব সময় একই অর্থে এটি ব্যবহার করছি কি না, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় জনতা, জমায়েত বা ভিড়—এসব শব্দের সঙ্গে মবের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু মব শব্দটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ—সহিংস, আবেগপ্রবণ এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মব কি কেবল সহিংসতা, নাকি এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে জনতা প্রচলিত আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেরাই শাস্তি কার্যকর করে?
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভিজিল্যান্টি ভায়োলেন্স অর্থাৎ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। চুরি বা গুজবের অভিযোগে গণপিটুনি, জনতার হাতে বিচার—এসব দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশেও আমরা এমন বহু ঘটনা দেখেছি, যেখানে ছেলেধরা গুজবের ভিত্তিতে নিরীহ মানুষকে আক্রমণ করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে জনতার মধ্যে একধরনের নিষ্ঠুরতা ও আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া কাজ করতে পারে।
তবে এটিকে কেবল তৃতীয় বিশ্বের সমস্যা হিসেবে দেখাও ভুল হবে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে জনতার সহিংসতার এক প্রকট রূপ দেখেছি, যেখানে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রেই একসময় কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মব তৈরি করে হত্যার লম্বা ইতিহাস রয়েছে। ফলে জনতার সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা অঞ্চলের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতা।
তবে ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মব সহিংসতার এই প্রবণতা নতুন নয়; কিন্তু এখন যেভাবে, যে উদ্দেশ্যে এবং যে ধরনের রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ ব্যবহার করে মবকে সংগঠিত করা হচ্ছে—তা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করেছে। তাই বলা যায়, মব সহিংসতা একদিকে যেমন প্রচলিত রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা বহন করে; অন্যদিকে এটি অনেক ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
মবের সংজ্ঞাটা কি আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার? মবের একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা কেমন হতে পারে?
নুসরাত চৌধুরী: মবের একটি নির্দিষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন এবং এই অস্পষ্টতাই আসলে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কারণ, মব কাকে বলা হবে, সেটির মধ্যেই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করে। ঐতিহাসিকভাবে মব শব্দটির উৎপত্তি একটি লাতিন শব্দ মোবিলে ভালগাস থেকে, যার অর্থ হলো ‘অস্থির জনতা’, যাদের সাধারণত শৃঙ্খলাহীন, আবেগপ্রবণ এবং রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হতো। শব্দটির মধ্যেই একটি নেতিবাচক মূল্যবোধ নিহিত আছে। এ কারণে মবের কোনো ইতিবাচক অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে জনতা শব্দের ক্ষেত্রে একাধিক ইতিবাচক অর্থ পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্নাহ আরেন্ডট মবকে জনতার একটি ‘ক্যারিকেচার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ মবের মধ্যে জনতার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও সেগুলো বিকৃত বা অতিরঞ্জিত রূপে প্রকাশ পায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মবকে জনতা থেকে পুরোপুরি আলাদা করা সহজ নয়; বরং এটি জনতারই একটি বিশেষ রূপ, যেখানে আবেগ, সহিংসতা এবং কখনো কখনো সংগঠিত উদ্দেশ্য মিলিত হয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মবকে প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্ত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ ধরনের সহিংসতা পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং ম্যাস মিডিয়েটেড অর্থাৎ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচালিত। ভারতের মুসলিমবিরোধী বা দলিতবিরোধী কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, সহিংসতা আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়, অংশগ্রহণকারীরা সংগঠিতভাবে আসে, এমনকি ভিডিও ধারণ করে, যা পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেকোনো ঘটনা ঘটলেই দ্রুত বহু মানুষ সেখানে জড়ো হয়। এটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে যে সহিংসতা ঘটে, তা সব সময় স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পূর্বপরিকল্পিত বা প্ররোচিত হতে পারে। এ কারণে মবের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণের চেয়ে কে কাকে মব বলছে এবং কেন বলছে—এই প্রশ্ন বিশ্লেষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই আমরা একটি সমাজের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার কাঠামো এবং পরিবর্তনের ধরন সম্পর্কে গভীরতর ধারণা পেতে পারি।
মবের সংজ্ঞা হয়তো আমরা ঠিক করতে পারব না। কিন্তু মবের কিছু বৈশিষ্ট্য তো আমরা বুঝতে পারি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মবের শিকার যারা হয়, তারা প্রান্তিক। উল্টো দিকে মব যারা করছে, তারা নানাভাবে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মবের বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।
নুসরাত চৌধুরী: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মবকে বোঝার একটি কার্যকর উপায় হলো একে এক্সপ্রেশন অব পাওয়ার বা ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা। মব সহিংসতা অনেক সময় কেবল তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী প্রকাশ্যে দেখাতে চায়, তারা কতটা প্রভাবশালী, কতটা সংগঠিত এবং কতটা আইনের ঊর্ধ্বে কাজ করতে সক্ষম; উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে থানা থেকে জোর করে বের করে আনা, তাকে জনসমক্ষে সংবর্ধনা দেওয়া কিংবা কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া। এসব কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো একধরনের ক্ষমতার প্রদর্শন। এখানে বার্তাটি স্পষ্ট: আমরা সংখ্যায় বেশি, তাই আমরা আইনকে অগ্রাহ্য করতেও পারি।
মব হলো এমন একটি গোষ্ঠীগত আচরণ, যেখানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বা ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সহিংসতা বা ভীতি প্রদর্শনের আশ্রয় নেয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, মবের লক্ষ্যবস্তু প্রায়ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তারা নারী হতে পারে, জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হতে পারে কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো গোষ্ঠী হতে পারে। অন্যদিকে মবের অংশগ্রহণকারীরা অনেক সময় নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা ক্রমেই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ঘটনাগুলো একবার-দুবার ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন বলা যায়; কিন্তু যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে—যেমন কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, কাউকে জনসমক্ষে অপদস্থ করা কিংবা সহিংসভাবে দমন করা—তখন সেটি একটি প্যাটার্ন বা প্রবণতায় পরিণত হয়। তখনই বোঝা যায়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে দেখা যায়, ভারত ও পাকিস্তানে গত কয়েক বছরে মব সহিংসতা অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে। ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব একে ‘মবোক্রেসি’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংগঠিত সহিংসতার একটি স্ক্রিপ্ট সেখানে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে একই স্ক্রিপ্ট অনুকরণ করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এটি একটি আইরনি বা পরিহাস তৈরি করেছে; যারা ভারতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের অনেকেই ভারতে চলমান একই ধরনের সহিংস কৌশলের অনুকরণ করছে।
তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো ভারত বা পাকিস্তানের মতো চরমে পৌঁছায়নি। এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা; রাষ্ট্র যদি দুর্বলতা দেখায় বা এ ধরনের সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, যখন এই সহিংসতা একটি প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্নে পরিণত হয়, তখন পরবর্তী শিকার কে হবে—তা আর নির্দিষ্ট থাকে না। আজ ভিন্ন মতাদর্শের বা অপছন্দের কেউ মবের শিকার হচ্ছে, কাল অন্য কেউ—এমনকি সাধারণ নাগরিকও—মবের শিকার হতে পারেন। তাই এই পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি।
আপনি ভারতের উদাহরণ দিলেন। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা মবকে ব্যবহার করে সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত হয়েছে। বাংলাদেশেও কি সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? এখানকার ধর্মীয় রাজনৈতিক দল এবং উগ্রপন্থীরা কি একইভাবে মবকে ব্যবহার করছে বলে আপনি মনে করেন?
নুসরাত চৌধুরী: এই প্রশ্নের সরল বা একরৈখিক উত্তর দেওয়া কঠিন। প্রথমত, উগ্রবাদী বলতে আমরা কাদের বোঝাচ্ছি, সেটিই একটি জটিল প্রশ্ন। সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দলকে উগ্রবাদী হিসেবে চিহ্নিত করলে সেটা সরলীকরণ হয়ে যেতে পারে। মাত্র দেড়-দুই বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে বাংলাদেশেও ভারত বা পাকিস্তানের মতো একটি সুসংগঠিত মব কালচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তবে আশঙ্কার জায়গা একেবারে নেই—এমনও বলা যাবে না। ভারত ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়—যখন এ ধরনের সহিংসতা বারবার ঘটে এবং শাস্তির মুখে পড়ে না, তখন তা ধীরে ধীরে একটি নরমাল পলিটিক্যাল প্র্যাকটিসে পরিণত হয়।
বাংলাদেশেও যদি একই ধরনের ঘটনা—যেমন কাউকে জনসমক্ষে অপদস্থ করা, সহিংসভাবে দমন করা বা আইন অমান্য করে বিচার করার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তাহলে সেটি অন্যদের জন্য একটি মডেল বা স্ক্রিপ্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে আমি এখনো বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। এখন প্রয়োজন নেতিবাচক প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করা, প্রতিরোধ করা এবং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে।
মব প্রথমে শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আমলে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে। আস্তে আস্তে সেটা আদালত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো স্থানেও ছড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী আমলের শেষ দিকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মব করে তাঁদের অব্যাহতি দিতে বাধ্য করা হয়। মব কি তাহলে একাডেমিক ফ্রিডমকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে?
নুসরাত চৌধুরী: এটি নিঃসন্দেহে একটি গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতা। তবে বিষয়টি কেবল একাডেমিক ফ্রিডমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামগ্রিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও জড়িত। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কী বলবেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী লিখবেন, কিংবা কোনো পাবলিক ইভেন্টে কী মত প্রকাশ করবেন—এসব যদি মবের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে, তাহলে সেটি একটি বড় সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
মবের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু শারীরিক সহিংসতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সামাজিক ও মানসিকভাবে প্রভাব ফেলে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো সেলফ-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। কেউ কথা বলার পর তাকে আক্রমণ করা একধরনের দমন। কিন্তু তার আগেই যদি মানুষ ভয়ে নিজেকে চুপ করিয়ে ফেলে, তাহলে সেটি আরও গভীর ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ। মানুষ যখন কথা বলতে ভয় পায়, মতপ্রকাশে সংকোচ বোধ করে, তখন সেটাকে যেকোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মব তৈরিতে কী ধরনের ভূমিকা রাখে?
নুসরাত চৌধুরী: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মব সহিংসতা তৈরিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে—এটি এখন প্রায় অনস্বীকার্য। বর্তমান সময়ে যেকোনো রাজনৈতিক প্রকল্প বা আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সহিংসতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর ও তাৎক্ষণিক। উদাহরণ হিসেবে আবারও ভারতের কথা বলা যায়। সেখানে বিভিন্ন উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, বিশেষ করে গোরক্ষা কমিটি তথাকথিত ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে সংগঠিত দলগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে। হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও, গুজব এবং উসকানিমূলক কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা অনেক সময় সরাসরি সহিংসতা উসকে দেয়।
গবেষক রাহুল মুখার্জি মোবাইল উইটনেসিং ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে এসব ভিডিও তৈরি, প্রচার এবং ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতার একটি চক্র তৈরি হয়। এই সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নিম্নবর্ণ, নারী কিংবা ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো ভারতের মতো চরমে না পৌঁছালেও এখানে একই ধরনের প্রবণতার ঝুঁকি স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো খবর বা গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায়ই সেই তথ্য যাচাই-বাছাই হয় না। ফলে ভুল তথ্য, বিকৃত বয়ান বা উসকানিমূলক কনটেন্ট খুব সহজেই জনতার আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভাবার বিষয় হলো এই যে এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহিংসতা উসকে দিতে বা ত্বরান্বিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে মব সহিংসতা বোঝার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।
মবের সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কি কোনো সম্পর্ক আছে?
নুসরাত চৌধুরী: মব সহিংসতার সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবে আমরা দেখি, এ ধরনের সহিংসতায় অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ পুরুষ এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি পুরুষালি ক্ষমতা প্রদর্শনে রূপ নেয়। গবেষক রাহুল মুখার্জি তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে মব সহিংসতা অনেক সময় বেকার বা অর্ধবেকার যুবকদের জন্য একধরনের সামাজিক ভূমিকা, এমনকি পুরোদস্তুর কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে, অন্যদিকে একটি বিশেষ ধরনের পুরুষতান্ত্রিক পরিচয়ও গড়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে মব কেবল সহিংসতার মাধ্যম নয়; বরং এটি একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের উপায় হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য পুরুষতন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মানে এই নয় যে নারীরা এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ না করলেও সামাজিক বা মতাদর্শগতভাবে এই সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারেন। তবে বাস্তবে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে সহিংসতা ঘটানোর কাজটি প্রধানত পুরুষদের দ্বারাই পরিচালিত হয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের অস্তিত্বের ওপর হুমকির অনুভূতি। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরা ক্ষমতাবান অবস্থানে থাকলেও যদি তারা মনে করে যে তাদের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তাহলে সেই ভীতি অনেক সময় সহিংস প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ, নারীর পোশাক, চলাফেরা বা সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া—এসব সেই উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তাই মব কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, বরং ক্ষমতা, লৈঙ্গিক পরিচিতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও জড়িত।
আপনি কি মনে করেন মব সংস্কৃতি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য একটি বড় হুমকি?
নুসরাত চৌধুরী: যেকোনো দেশেই মব সহিংসতা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি। তবে এটি কত বড় হুমকি, তা অনেকাংশে নির্ভর করে আমরা গণতন্ত্র বলতে কী বুঝি, তার ওপর। যদি আমরা গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের সমন্বিত রূপ হিসেবে দেখি, তাহলে স্পষ্ট হয়—মব সহিংসতা সেই কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, মব সহিংসতার মূল বৈশিষ্ট্যই হলো রাষ্ট্রের আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে নিজেরাই বিচার কার্যকর করা।
তবে একটি জটিল বাস্তবতাও এখানে রয়েছে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অনেক সময় আন্দোলন, বিশেষ করে ছাত্র বা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ সহিংস রূপ নিতে পারে। এসব আন্দোলন কখনো কখনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথও খুলে দেয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন সহিংসতা এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে তা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থকেই শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী করে।
মব শব্দটি আমরা সচেতন বা অবচেতনভাবে সেসব সহিংস আচরণের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করি, যেগুলো সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত হানে এবং তাদের নিরাপত্তাকে আরও বিপন্ন করে। প্রান্তিক মানুষের ন্যায্য দাবি বা প্রতিবাদ যদি কখনো সহিংসও হয়, সেগুলোকে সাধারণত একইভাবে মব বলা হয় না বা বলাটা যুক্তিযুক্ত হবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ঘটনাকে মব সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেগুলোকে প্রান্তিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন; বরং এগুলোর পেছনে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে বলে মনে হয়। এই প্রেক্ষাপটে মব কালচার গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য একটি বাস্তব ও উদ্বেগজনক হুমকি—বিশেষ করে তখন, যখন এটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এবং বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।
তবে আইনের শাসনের পাশাপাশি আমাদের এটাও লক্ষ রাখতে হবে যে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। রাজনৈতিক আদর্শ না মিললেই তাদের ‘মব’ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক দমন করাটা গণতান্ত্রিক ধারণার পরিপন্থী। অনেক সময় রাষ্ট্রের সহিংসতার জবাব হিসেবেও মব সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। রাষ্ট্র যে সহিংসতার একমাত্র কর্তা নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত সবার সেটা বোঝার দায় রয়েছে।
অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন যে নির্বাচিত সরকারের আমলে মব সহিংসতা বন্ধ হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
নুসরাত চৌধুরী: আমি আগেই বলেছি, আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জনতার রাজনীতি’ কখনো কখনো মব সহিংসতায় পর্যবসিত হয়। সামাজিক সচেতনতা, বিচারব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ এবং গণতন্ত্রের চর্চা জনতার এই সহিংস রূপটাকে সামলে রাখে। গত দেড়–দুই বছরে যে ধরনের কার্যকলাপ রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বীকৃতি পেয়েছে, তাতে অনেকের কাছেই হয়তো মবকে অধিকার আদায়ের বা মতপ্রকাশের একটি সহজ পন্থা বলে মনে হয়েছে। এই ধারণা যখন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা দেয়, তখন তাকে প্রতিহত করাটা সহজ নয়।
সরকারকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং মব বা অন্য যেকোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একচোখা আচরণ পরিহার করতে হবে। রাষ্ট্র যে সবার অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সমান উদ্যোগী—এ ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থাপন না করতে পারলে এ ধরনের সহিংসতা চলতেই থাকবে। এখানে সমস্যাটা শুধু ঘটনা ঘটে গেলে তার বিচার করা নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতা ও বৈষম্য কমিয়ে আনতে সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা নেওয়াটা আরও বেশি জরুরি।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
নুসরাত চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।