ঋণখেলাপিরা কেন সংস্কারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়

· Prothom Alo

আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকটটা যে ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত; বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের মন্তব্যে সেটা আবারও সামনে এল। তাঁর মতে, ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছেন, তাঁরাই সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছেন। আমরা মনে করি, আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর অসুখ শনাক্ত করার জন্য এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিন রোববার ‘রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক অধিবেশনে বাংলাদেশ সংস্কার প্রচেষ্টা সফল না হওয়ার পরিষ্কার কিছু কারণ উঠে এসেছে।

Visit likesport.biz for more information.

সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনাটা অনেক পুরোনো। আইন প্রণয়ন, নীতিমালা ঘোষণা কিংবা উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ—সবই নিয়মিত ঘটছে। তবে রেহমান সোবহান যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন, তা হলো সংস্কার কেবল একটি আইন পাস করার বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক ও জটিল প্রক্রিয়া। আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি, কার্যকর প্রয়োগ এবং ফলাফল মূল্যায়ন—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশনসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া মৌলিক সংস্কারগুলো হোঁচট খাওয়ার বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক বলেই আমরা মনে করি। অথচ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রধানতম আকাঙ্ক্ষায় ছিল অগণতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী ও গোষ্ঠীস্বার্থের শাসনকাঠামো থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনা।

সম্প্রতি ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধন করে পুরোনো বিতর্কিত ব্যাংকমালিকদের কাছে ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গটিও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় দায় অবশ্যই ব্যাংক খাতের। ১৯৮২ সালে বেসরকারি মালিকানায় প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। অতীতে সব সরকারই প্রয়োজন না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিজেদের লোকদের ব্যাংক পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়াভাবে কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে ব্যাংক খাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একটি দুষ্টচক্র প্রতিষ্ঠা পায়।

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এ বাস্তবতায় ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা প্রয়োজন ছিল। তবে বাস্তবতা হলো সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধনের বিষয়টি সংগতিপূর্ণ নয়।

একটি গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও গত ৫৫ বছরে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অথচ যেকোনো সংস্কার সফল করতে হলে তার প্রতি জনগণের শক্তিশালী সমর্থন প্রয়োজন। আমরা মনে করি, রেহমান সোবহান যথার্থই বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই হচ্ছে সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এ জন্য চাই অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থা।’

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারের সঙ্গে নাগরিকের জবাবদিহির সম্পর্কটা না থাকায় ঋণখেলাপি, ব্যাংকখেলাপিরা অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিশ্চিত করে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তি দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি দলের যেমন অগ্রণী ভূমিকা আছে, একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও গঠনমূলক ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। নাগরিক সমাজের দিক থেকে সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও চাপ থাকা প্রয়োজন।

Read full story at source