পাঠচক্রই গড়ে তোলে বুদ্ধিবৃত্তি

· Prothom Alo

একটি পাঠচক্র বা পাঠকগোষ্ঠী তৈরির উদ্দেশ্য শুধু কয়েকজন মানুষকে এক ছাদের নিচে বসিয়ে নির্দিষ্ট বই নিয়ে কথা বলা নয়। পাঠচক্রের মাধ্যমে যেন নতুন পাঠক তৈরি ও তাদের নিয়ে একটা কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারি। সেই পাঠকদেরই খুঁজতে হবে, যারা নিয়মিত বই পড়ে।

আমাদের কমিউনিটি, কর্মস্থল, বিশ্ববিদ্যালয় বা পাড়ায় কারা সত্যিই বই পড়েন এবং পড়ার আগ্রহ আছে, তাঁদের একত্র করতে হবে। যাঁরা পড়তে পড়তে বইতে আন্ডারলাইন করেন, নোট নেন, লেখকের সঙ্গে তর্ক করেন, লেখা নিয়ে অনেক রকম কল্পনা করেন, এর মধ্যে তাঁরা যাতে থাকেন। পাঠচক্র টিকে থাকে এমন পাঠকদের মাধ্যমেই।

Visit freshyourfeel.org for more information.

লাঞ্চের সময় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন, পার্কে হাঁটতে গিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করুন, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করুন—এখন কী পড়ছেন? এই প্রশ্নই ঠিক করে দেবে কারা আপনার পাঠের সাথি হবেন।

সম্ভাব্য সদস্যদের খোঁজ পাওয়ার পর তাঁদের সংগঠিত করুন। যোগাযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ই–মেইল, মেসেজিং গ্রুপ বা প্রয়োজনে ছাপানো আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে পারেন। স্পষ্ট করে বলতে হবে—এটা কোনো লেকচার সিরিজ নয়, কোনো বিতর্ক ক্লাব নয়; এটা একসঙ্গে এক পাঠযাত্রা। এমন একটা ভেন্যু ঠিক করুন, যেখানে সহজে আসা-যাওয়া করা যায় এবং আলাপচারিতার জন্য উপযুক্ত। একই স্থানে নিয়মিত আয়োজন করলে ভালো হয়।

প্রথম বই নির্বাচনের সময় সদস্যদের পড়ার রুচি বুঝতে হবে। কেউ হয়তো ফিকশন পছন্দ করেন, কেউ ইতিহাস, দর্শন, জীবনী বা বিজ্ঞানের বই। একটা সার্ভে করতে পারেন। প্রিয় ঘরানা, লেখক ও পড়ার অভ্যাস সম্পর্কে জানতে পারেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাই যেন মনে করেন যে তাঁদের মতামত নেওয়া হয়েছে। বই নির্বাচন হতে হবে গণতান্ত্রিক। সদস্যদের বইয়ের নাম প্রস্তাব করতে দিন। সেখান থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকা করুন। যখন পাঠক বই বাছাইয়ে অংশ নিতে পারেন, তখন তাঁরা সেটা পড়ার দায়িত্বও অনুভব করেন। নির্বাচিত বইয়ের নাম অন্তত এক মাস আগে বলুন, যেন সবাই সময় নিয়ে পড়তে পারেন।

মাসে মাসে আলোচনা হলে সবচেয়ে ভালো। সাপ্তাহিক আড্ডা টিকিয়ে রাখা কঠিন; দুই বা তিন মাস পরপর হলে উৎসাহ হারিয়ে যাবে। মাসিক ছন্দ পাঠকদের মনোযোগ দিয়ে পড়তে ও ভাবতে সাহায্য করে। একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করুন! প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার হতে পারে। এটা শৃঙ্খলা আনে।

আলোচনার প্রতিটা সেশনের জন্য অন্তত তিনজন মূল আলোচক ঠিক করুন। আগে থেকে তাদের জানিয়ে দিন এবং নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। একজন থিম নিয়ে বলবেন, আরেকজন চরিত্র বা যুক্তি নিয়ে, তৃতীয়জন ব্যক্তিগত প্রতিফলন বা সমালোচনা তুলে ধরতে পারেন। এবার তাঁদের বক্তব্যের পর অন্যদের জন্য আলোচনার সুযোগ দিন। পরের সেশনে নতুন তিনজনকে মূল আলোচনার দায়িত্ব দিন।

পাঠচক্রের সদস্যসংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হলে সবচেয়ে ভালো। এর বেশি হলে পরিচালনা কঠিন হয়ে যায়। পাঠচক্রের স্পিরিটকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ১ বছর পূর্তি, ৫০তম বই—এসব উদ্‌যাপন করুন। লেখকদেরও মাঝেমধ্যে অতিথি বক্তাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।

একটা পাঠচক্র কেবল বই আলোচনা নয়, এটা আমাদের ব্যস্ত ও অস্থির পৃথিবীতে মননশীল কথোপকথনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটা প্রয়াস। পাঠচক্র হয়ে উঠতে পারে এক দীর্ঘস্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তির প্ল্যাটফর্ম।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

Read full story at source