‘সংসারে এমনিতেই টানাটানি, এখন তেলের দাম বাড়ার চাপ’
· Prothom Alo

তপ্ত রোদে ছাতা মাথায় দিয়ে একটি মোটরসাইকেলের ওপর বসে আছেন পেয়ার মোহাম্মদ। সামনে মোটরসাইকেলের লম্বা সারি, তা এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। আবার মাঝেমধ্যেই থেমে যাচ্ছে। সবার চোখেমুখেই বিরক্তি। চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস এজেন্সি ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলের এই সারিতেই আজ রোববার দুপুরে কথা হয় পেয়ার মোহাম্মদের সঙ্গে।
Visit playerbros.org for more information.
আলাপে পেয়ার মোহাম্মদ জানান, মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করে তাঁর যে আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। তবে বেশ কিছুদিন ধরে আয় কমেছে তাঁর। কারণ, জ্বালানি তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করেই অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। এখন নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি বলেন, ‘সংসারে এমনিতেই টানাটানি, এখন আবার তেলের দাম বাড়ার চাপ। এই চাপটা কীভাবে সামলাব, বুঝতে পারছি না। খুব কষ্টে আছি।’
পেয়ারের বাড়ি পটিয়ায়, শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে শহরে এসে রাইড শেয়ার করেন। বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো এখন আর সহজ নয়। তবু সংসারের দায়ে রাস্তায় নামতে হয় তাঁকে। জানালেন, দিনে সাধারণত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো, কখনো দেড় হাজারও উঠত। কিন্তু গত এক মাসে আয় কমেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কারণ একটাই, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কাটছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
টাইগারপাস ফিলিং স্টেশনে আজ দুপুর ১২টার দিকে দেখা গেল, অন্তত ১১০টি মোটরসাইকেল সারিতে অপেক্ষা করছে। সময়ের সঙ্গে সারিতে বাড়ছিল মোটরসাইকেলের সংখ্যা । কেউ দুই ঘণ্টা, কেউ তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি তেল নিচ্ছেন। সবার মুখেই বিরক্তি, শরীরে ক্লান্তি।
সারিতেই দাঁড়িয়ে আছেন মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। তিনি জানান, সকালে তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরেও তেল পাননি। শেষে টাইগারপাসে এসে দেখেন, সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবু দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
জ্বালানি তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলের সারি। আজ বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস ফিলিং স্টেশনেএকই জায়গায় কথা হয় রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি নগরের অক্সিজেন এলাকায়। পেশায় গাড়িচালক। লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতেই তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়লে আমাদের তো ভাড়াও বাড়াতে হয়। না বাড়ালে চলবে না। কিন্তু যাত্রীরা সেটা মানতে চাইছেন না। ভাড়া নিয়ে আজ প্রথম দিনই তর্কে জড়াচ্ছেন।
রিয়াজ জানান, আগে যেখানে নির্দিষ্ট ভাড়ায় যাত্রী পাওয়া যেত, এখন সেখানে প্রায় প্রতিটি ট্রিপেই দর-কষাকষি করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি যাত্রীদের সঙ্গে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরের প্রায় সব ফিলিং স্টেশনের চিত্র এখন একই। অর্ধশতাধিক স্টেশনের বেশির ভাগেই ছোট-বড় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এসব ফিলিং স্টেশনে কেউ তেল পেয়ে ফিরছেন, কেউ আবার খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
‘দাম বাড়ানো হলো, এবার তেল চাই’
নগরের বায়েজিদ থানাধীন হাশমিক্যাল এলাকার সেনা ফিলিং স্টেশনে সকাল ১০টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মোহাম্মদ জাকির হোসেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার মতো অবস্থা। বিরক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দিনে দুইবার তেল নিতে হয়। এক মাস ধরে দিনে একবার তেল নিতেই ঘাম ছুটে গেছে। দাম বাড়ানো হলো, এবার অন্তত পরিমাণমতো তেল চাই।’ জাকির হোসেন হিলভিউ এলাকায় থাকেন। সকাল ৯টায় বাসা থেকে বেরিয়ে সরাসরি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তেল পান।
একই স্টেশনে কথা হয় তাইমুর রহমানের সঙ্গে। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছেন। জাহাজে তেল আসছে, কিন্তু ফিলিং স্টেশনে ভিড় কমছে না, বরং বাড়ছে। ফুয়েল কার্ড, ট্যাগ অফিসার—কিছুই শৃঙ্খলা আনতে পারছে না।
জেরি ক্যান, ড্রাম, বোতল নিয়েও তেল নিতে আসেন অনেকেই১ কিলোমিটারজুড়ে গাড়ির সারি
দুপুর গড়িয়ে বেলা ২টা। নগরের গণি বেকারি মোড়ে গিয়ে যেন থমকে দাঁড়ায় যানবাহনের স্রোত। কিউ সি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ সারি। গণি বেকারি থেকে জেএমসেন হল মোড় পর্যন্ত সড়কজুড়ে সারিবদ্ধ প্রাইভেট কার আর মোটরসাইকেল।
সরেজমিন দেখা গেল, কেউ গাড়ির সিটে আধশোয়া হয়ে চোখ বুজে আছেন, কেউ পাশে দাঁড়িয়ে চা হাতে সময় কাটাচ্ছেন। কারও চোখ মোবাইলের পর্দায়। লাইন একটু এগোলেই হঠাৎ যেন সবার মধ্যে নড়াচড়া শুরু হচ্ছে। মোটরসাইকেলগুলো ঠেলে সামনে নেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেট কারগুলো ধীরে ধীরে স্টার্ট দিয়ে এগোচ্ছে। যাঁরা দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই আলোচনার বিষয় তেলের নতুন দাম।
গতকাল শনিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম আজ থেকে কার্যকর হয়েছে।
এই লাইনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পঙ্কজ দেবনাথ। একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালান তিনি। সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা জেনেও লাইন ছাড়েননি। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল শহরের বাইরে যেতে হবে। আজ তেল না নিলে চলবে না। যত সময় লাগুক, তেল নিয়েই ফিরব।’ চালকেরা বলছেন, বৈশাখের এই কড়া রোদে অপেক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কেউ মাথায় পানি ঢালছেন, কেউ ছায়া খুঁজছেন।