‘জীবন কাছ থেকে দেখলে ট্র্যাজেডি, দূর থেকে দেখলে কমেডি’

· Prothom Alo

নিঃশব্দ পর্দায় হাসির ঝড় তুলেও মুহূর্তেই তিনি দর্শকদের চোখ ভিজিয়ে দিতেন। মাথায় টুপি, হাতে বাঁকা ছড়ি আর অনন্য শরীরী ভাষা—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিশ্ব সিনেমার এক অবিস্মরণীয় ভাষা। সেই অভিনেতার নাম চার্লি চ্যাপলিন। আজ তাঁর জন্মদিন। তিনি ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নির্বাক চলচ্চিত্রের প্রাণভোমরা। অভিনয়নৈপুণ্যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন তিনি।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে চ্যাপলিনকে নিয়ে বলা হয়েছে, ‘চ্যাপলিন শুধু কৌতুক অভিনেতা বা কমেডিয়ান নন, তিনি ছিলেন সময়ের বিবেক; সমাজের বৈষম্য, দারিদ্র্য আর মানবিক সংকটকে তিনি তুলে ধরেছেন হাসির আড়ালে, গভীর ব্যঙ্গ আর বেদনায়।’

Visit biznow.biz for more information.

চার্লি চ্যাপলিন

যেভাবে সিনেমায়
লন্ডনের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া চ্যাপলিনের শৈশব ছিল কঠিন। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, আর্থিক অনটন—সব মিলিয়ে ছোটবেলাতেই জীবনের বাস্তবতা তাঁকে চিনতে হয়। খুব অল্প বয়সে মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে পা রাখেন চলচ্চিত্রে। বিবিসির সূত্রে জানা যায়, প্রচণ্ড দারিদ্র্য আর অর্থকষ্টে জর্জর থাকায় মাত্র ৭ বছর বয়সেই উপার্জনের পথ খুঁজতে হয় তাঁকে এবং ৯ বছর বয়সে ছোটদের যাত্রাদলে যোগ দেন।
চ্যাপলিনের পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। তাঁর চলচ্চিত্র হাস্যরসপ্রধান হলেও সেসব চলচ্চিত্রে মিশে থাকত সূক্ষ্ম রাজনীতি। থাকত নিম্নবিত্তের জীবন। বেকারত্বের ওপর শিল্পায়নের প্রভাব উঠে এসেছে তাঁর চলচ্চিত্রে। হলিউডে এসে ‘দ্য ট্র্যাম্প’ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়। ‘মডার্ন টাইমস’ ও ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’–এর মতো বহু চলচ্চিত্রে তিনি কৌতুকের আড়ালে সমাজের অসংগতি ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ তুলে ধরেন।

চার্লি চ্যাপলিন

জনপ্রিয়তার শুরু
১৯১৫ সালের দিকে তুমুল আলোচিত নাম চার্লি চ্যাপলিন। তখন একনামে তিনি পরিচিতি পাচ্ছেন। তখন তিনি পরিচালনায় সবে প্রবেশ করেছেন। কোনো কোনো কাজে পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম না গেলেও অভিনেতা হিসেবে ‘আ নাইট আউট’, ‘আ ওমেন’, ‘দ্য ভ্যাগাবন্ড’, ‘পুলিশ’, ‘দ্য ইমিগ্র্যান্ট’সহ একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা দেয়। একের পর এক লিখেছেন চিত্রনাট্য।
তবে চ্যাপলিনের পথ একেবারে মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কের মুখে পড়তে হয় তাঁকে, এমনকি একসময় দেশত্যাগও করতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চ্যাপলিন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে থাকেন। এ কারণে তাঁকে সব সময় নজরে রাখে এফবিআই। সে সময় চ্যাপলিনের কোনো ভুল পেলেই তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করত এফবিআই। এ কথা চ্যাপলিনই লিখেছিলেন। এমনকি সে সময় এফবিআই চ্যাপলিনের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনে। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শ ও নারী পাচারসংক্রান্ত ঘটনাও।

১৯১৮ সালে প্রথম বিয়ে করে চ্যাপলিন। ছবি: ফেসবুক থেকে

প্রথম বিয়ে
শুটিং করে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিনের পরিচয় হয় অভিনেত্রী মিলড্রেড হ্যারিসের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। হঠাৎ একদিন এই অভিনেত্রী জানান, তিনি মা হতে যাচ্ছেন। ১৯১৮ সালে হ্যারিসকে বিয়ে করেন চ্যাপলিন। এই বিয়েতে সুখী ছিলেন না চ্যাপলিন। বোঝাপড়া নিয়ে তাঁদের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে থাকে। এর মধ্যেই চ্যাপলিন জানতে পারেন, হ্যারিসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবরটি সত্য নয়। এটা ছিল বানোয়াট। পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরেবর্তী বিয়ে নিয়ে তিনি খুব বেশি খুশি ছিলেন না। আরও দুটি বিচ্ছেদ হয়। চতুর্থ বিয়ে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘ও’নিলের (চতুর্থ স্ত্রী) সঙ্গে সংসার করার দিনগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত।’

চার্লি চ্যাপলিন

ব্যক্তিজীবনে টানাপোড়েন
সাফল্যের দিক থেকেও চ্যাপলিন ছিলেন শীর্ষে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পীদের একজন ছিলেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ বর্তমান মূল্য অনুযায়ী শত মিলিয়ন ডলারের বেশি বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা একসময় বদলে যায়। অভিনয় থেকেও তিনি দূরে সরে যান। চ্যাপলিন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও নারী পাচারসংক্রান্ত মামলায় দিশাহারা ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতা। পরবর্তী সময়ে চ্যাপলিন নির্বাসিত হন। তারপরও তিনি জীবন নিয়ে খুশি থাকার চেষ্টা করে গেছেন। আত্মজীবনী ‘চার্লি চ্যাপলিন’ বইয়ে তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘আমি ভালোবাসা, বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেয়েছি।’

ইরানের জাফর পানাহি টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালীর তালিকায়

সেরা উক্তি
চ্যাপলিনের কিছু উক্তি আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর সেরা উক্তির একটি, ‘জীবন কাছ থেকে দেখলে ট্র্যাজেডি, দূর থেকে দেখলে কমেডি।’ চার্লি চ্যাপলিন তাই শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক দর্শন। হাসির আড়ালে জীবনকে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আজও বিশ্বজুড়ে সমান প্রাসঙ্গিক। এই অভিনেতা ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

Read full story at source