কোনভাবে পান্তা খেতে সবচেয়ে মজা, আমার রেটিংয়ের সঙ্গে আপনারটা মিলিয়ে দেখুন
· Prothom Alo

বৈশাখ এলেই ইলিশের দাম বেড়ে আকাশ ছোঁয়। বছরজুড়ে যে বাসি ভাত রাতভর হাঁড়ির কোনায় পড়ে থাকে, বৈশাখের দিন সেই ভাতের কী সমাদর! বৈশাখে পান্তার সঙ্গে ইলিশের যোগ কবে, কীভাবে ঘটেছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে পান্তার সঙ্গে ইলিশ খেতে মন্দ লাগে না। তাই বলে এটাই কি সেরা জুটি? পান্তা খাওয়া যায় আরও নানা উপায়ে। চৈত্রের ২০ তারিখ থেকে সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত নিয়মিত সকালের নাশতায় মাছ, ভর্তা, ভাজি, দইসহ নানা উপকরণে পান্তা খেয়ে রেটিং করেছি আমি হাসান ইমাম
Visit amunra.help for more information.
পান্তা ভাত তৈরি করতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। শহুরে সংস্কৃতিতে অনেকে ভাত রান্নার পরই পানি ঢেলে সেটা খেতে শুরু করেন পান্তা হিসেবে। এভাবে পান্তা তৈরি করলে প্রকৃত স্বাদ কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না।
চালের ক্ষেত্রে বলা জরুরি, চিকন চালের পান্তার চেয়ে কিছুটা মোটা চাল নেওয়ার চেষ্টা করুন। আমন ধানের চালে সবচেয়ে ভালো পান্তা বানানো যায়। কারণ, এই চাল বেশি মাংসালো, ভিজিয়ে রাখলে সহজে নরম হয়ে যায়, খেতেও মিষ্টি লাগে।
কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজে পান্তা
মরিচ আর পেঁয়াজে পান্তা ভাতবাংলার গ্রামীণ জীবনে পান্তার সবচেয়ে কমন সহযোগী এই কাঁচা মরিচ ও কাঁচা পেঁয়াজ। প্লেটে পানিসহ পান্তা ভাত নিয়ে তার মধ্যে কাঁচা পেঁয়াজ, মরিচ ও লবণ দিয়ে হাতে ডলে নিতে হবে।
এভাবে পান্তা খেলে পান্তা ভাতের নিজস্ব গন্ধটা সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। সঙ্গে কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজের ঝাঁজ নাকে এসে লাগে। তবে ঝাল ভালোবাসলে একটা কাঁচা মরিচের সঙ্গে অর্ধেক পরিমাণ বোম্বাই মরিচ মিশিয়ে নিলে ঘ্রাণ আরও প্রকট হয়, স্বাদও বাড়বে।
রেটিং: ৫/১০
শুকনা মরিচের সঙ্গে পান্তা
পোড়া মরিচে পান্তা ভাতশুকনা মরিচ সাধারণত আমরা চুলায় টেলে তারপর পান্তা ভাতে মেশাই। অনেকে কোনো ভাজাভুজির পর তেলতেলে কড়াইতে শুকনা মরিচ ভেজে নেন। তবে আমার পরামর্শ তাওয়ায় টেলে না নিয়ে সরাসরি আগুনে পোড়ানোর।
একটা চিকন কাঠি বা শিকের মধ্যে শুকনা মরিচ গেঁথে নিয়ে সেটা চুলার আগুনের ওপর এপিঠ-ওপিঠ করে সেঁকে নিন। এরপর সেই পোড়া মরিচ পেঁয়াজ, লবণসহ পান্তা ভাতে ডলে মেখে নিন।
এবার একটা লোকমা মুখে তুললেই দেখবেন স্মোকি একটা ফ্লেভার এসে প্রথমে নাকে লাগবে, তারপর মুখ পেরিয়ে বাকি ইন্দ্রিয়গুলোতে পৌঁছাবে।
রেটিং: ৬.৫/১০
কচুর মুখি-ইলিশের বাসি ঝোলে পান্তা
ইলিশের বাসিত ঝোলে পান্তাছড়া বা কচুর মুখি দিয়ে ইলিশ রান্না হয় অনেক বাড়িতে। খেতে দারুণ লাগে, তবে এই জুটির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন পান্তা ভাত। আগের রাতে রান্না করা কচুর মুখি দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল রেখে দিন এতটা পাত্রে।
তারপর সকালে টালা শুকনা মরিচ দিয়ে আগে প্লেটের ভাতটা মাখিয়ে নিন। লবণ কতটা দেবেন, সেটা নিজেই আন্দাজ করে নিতে পারবেন। এরপর তাতে মেশান বাসি ইলিশের ঝোল। কচুর মুখিগুলো হাতে ভেঙে নিন। এবার খেয়ে দেখুন, মুখে লেগে থাকবে।
রেটিং: ৭/১০
কালিজিরাভর্তা দিয়ে পান্তা
কালিজিরাভর্তা দিয়ে পান্তার স্বাদ কিছুটা এক্সোটিক ধরনেরকালিজিরা বেটে পেঁয়াজকুচি ও কাঁচা মরিচ দিয়ে ভর্তা করে নিতে হবে। এরপর পান্তা ভাত লবণ দিয়ে চটকে নিয়ে তার সঙ্গে মেশাতে হবে কালিজিরাভর্তা। এই পান্তার স্বাদ কিছুটা এক্সোটিক ধরনের।
এই পান্তায় কালিজিরার স্বাদ-গন্ধ খুব শক্তভাবেই পাওয়া যায়। যাঁরা ভেষজ খাবারের প্রতি প্রবল টান অনুভব করেন, তাঁদের কাছে ভালো লাগবে কালিজিরা ভর্তায় পান্তা ভাত। তবে আমার কাছে এই পান্তা লেগেছে মাঝারি স্বাদের।
রেটিং: ৬/১০
মুচমুচে আলুর সঙ্গে পান্তা ভাত
মুচমুচে আলুর সঙ্গে পান্তা ভাতএটাকে আলুর চিপস বললেও ভুল হবে না। মাঝারি আলু পাতলা চাকচাক করে কেটে লবণ-হলুদ মেখে ডুবোতেলে ভেজে তুলতে হবে। এরপর প্লেটে পান্তা ভাত নিয়ে আগে একটু লেবুর রস আর শুকনা মরিচ-পেঁয়াজে ভাতটা মেখে নিতে হবে।
তারপর তাতে কড়কড়ে আলু ভাজা ভেঙে মিশিয়ে আলতো হাতে মেশাতে হবে। পান্তার সঙ্গে আলুভাজি অল্প অল্প করে মিশিয়ে খেতে হবে। মুখে নরম পান্তা আর কড়কড়ে আলুভাজি একসঙ্গে যে তৃপ্তি দেবে, সেটা ভোলার নয়।
এই পান্তা খাওয়া যায় আলুর চিপসের বদলে ঝিরি ঝিরি আলুভাজি অথবা আলু-করলার মুচমুচে ভাজির সঙ্গেও।
রেটিং: ৮/১০
পান্তার যেসব গুণ জানালেন পুষ্টিবিদআলুভর্তা ও ভাজা ডিমে পান্তা
আলুভর্তা ও ডিম ভাজি দিয়ে পান্তা ভাতশুধু আলুভর্তা ও শুধু ডিমভাজি দিয়ে আলাদা করে পান্তা মাখালেও খেতে ভালো লাগে। তবে এই দুটি পদ একসঙ্গে পান্তায় মেশালে খেতে লাগবে অমৃত। তবে তার জন্য কৌশলটাও জেনে রাখা জরুরি।
সেদ্ধ আলুর সঙ্গে তেলে ভাজা শুকনা মরিচ, লবণ ও বেরেস্তার পাশাপাশি ঝুরি আমের আচারের তেল মিশিয়ে ভর্তা বানাতে হবে। এবার লবণ দিয়ে পান্তা চটকে নিয়ে তারপর আলুভর্তা দিয়ে মেখে নিন।
আচারের বয়াম থেকে ঝুরি আম কিছুটা এই ভাতের সঙ্গে মেখে নিন। এবার গরম–গরম ডিমভাজি ছিঁড়ে নিয়ে পান্তার সঙ্গে মুখে পুরুন। ‘আহ্’ শব্দটা আপনা-আপনি মুখ দিয়ে চলে আসবে।
রেটিং: ৮.৫/১০
দই পান্তা
টক দই দিয়ে পান্তা মাখাদই দিয়ে পান্তা ভাত, শুনে অনেকে ভ্রু কুঁচতে তাকাতে পারেন। তবে যিনি এভাবে পান্তা খেয়েছেন, তিনি জানেন এর স্বাদ ভোলার নয়। আমি যেমন দুভাবে এই পান্তা খেয়েছি।
প্রথমত, যাঁরা টক দই খেতে পছন্দ করেন, তাঁরা পান্তার পানি ঝরিয়ে তার সঙ্গে টক দই, অল্প কাঁচা মরিচকুঁচি দিয়ে মেখে পান্তা খেতে পারেন। গরমে এভাবে পান্তা খাওয়ার পর বেশ সতেজ লাগবে।
আমার কাছে এভাবে টম–মিষ্টি দই দিয়ে পান্তা খেতে বেশি ভালো লেগেছেদ্বিতীয় উপায়টা হলো পান্তার সঙ্গে টক-মিষ্টি দই মেশানো। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটা বেশি ভালো লেগেছে। লাল আমনের চালের পান্তা ভাত লবণ দিয়ে মেখে নিতে হবে। এরপর পান্তার সঙ্গে টক-মিষ্টি দই দিয়ে আবারও মেখে নিতে হবে। এই পান্তায় পেটও ঠান্ডা থাকবে।
রেটিং: ৮/১০
নারকেল কোরা, গুড় ও দুধের পান্তা
নারকেল কোরা, গুড় ও গুঁড়ো দুধের পান্তাযাঁরা মিষ্টি খাবার ভালোবাসেন, তাঁরা এভাবে পান্তা খেতে বেশি পছন্দ করবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমিও এভাবে পান্তা খাই ছোটবেলা থেকে। এই পান্তায় গুড়ের ভিন্নতা খাবারের স্বাদেও পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
আমি যেমন খেজুরের গুড়, আখের গুড় ও তালের গুড় দিয়ে এভাবে পান্তা খেয়ে দেখেছি। যেহেতু পান্তাটা সাধারণত গ্রীষ্মকালেই বেশি খাওয়া হয়, তাই এই সময়ের ফ্রেশ গুড় হিসেবে তালের গুড়কেই আমি এগিয়ে রাখব। তবে অন্য গুড়েও খারাপ লাগবে না। এই পান্তা প্লেটে তোলার সময় বাড়তি পানি নেওয়ার দরকার নেই। কারণ, এটা কিছুটা মাখা মাখা হবে।
কিছুটা নারকেল কোরা, গুড় আর গুঁড়া দুধ প্লেটে নিয়ে পান্তার সঙ্গে মাখতে হবে। তারপর স্বাদ বুঝে তাতে একটু লবণ যুক্ত করতে হবে। এই পান্তায় গুড়ের পাশাপাশি লবণ থাকার কারণে নোনতা মিষ্টি স্বাদের হবে, আর গুঁড়া দুধ, নারকেলসহ খেতে খুবই ভালো লাগবে।
রেটিং: ৮.২/১০
আরও নানা উপায়ে পান্তা খাওয়ার প্রচলন আছে বিভিন্ন অঞ্চলে। শাকভাজি, বেগুনভাজা অথবা বেগুন পোড়া, শুঁটকিভর্তা দিয়ে, ডালভর্তা, মুড়ি অথবা কলা দিয়ে পান্তা খেতেও মন্দ লাগে না। আপনার অঞ্চলে কোন উপকরণে পান্তা খাওয়ার প্রচলন বেশি, তা জানাতে পারেন।
শজনে ভেবে লাজনা খাচ্ছেন কি? দুটির পার্থক্য জেনে রাখুন