সাউন্ড বক্স–মাইক বাজালে ‘মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান থেকে বহিষ্কার করা হইবে’

· Prothom Alo

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের একটি গ্রামে সাউন্ড বক্স, মাইক সেট বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ওই গ্রামের মসজিদ কমিটি। এ ঘোষণা জানার পরও কেউ বাজালে তাঁদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হবে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁদের কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। ওই গ্রামের নাম মাজগ্রাম।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

গত বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী প্রচার মাইকের মাধ্যমে এলাকায় এ ঘোষণা জানিয়ে দেয় বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটি। এ সিদ্ধান্ত মাইকে প্রচারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ৩১ সেকেন্ডের ভিডিওতে একটি ভ্যানে দুটি মাইকে প্রচার করা বার্তায় শুনতে পাওয়া যায়, ‘আজ থেকে মহল্লায় সাউন্ড বক্স, মাইক সেট বাজানো নিষেধ। কোনো ব্যক্তি ভুল করিয়া জেনেশুনে সাউন্ড বক্স, মাইক সেট বাজান, তাঁদেরকে মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান থেকে বহিষ্কার করা হইবে। আদেশক্রমে মাজগ্রাম বড় মসজিদের কমিটিবৃন্দ।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী জানান, ২৭ মার্চ, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদ কমিটির সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন যে বড় মাজগ্রাম মহল্লার অধীনে কোনো বাড়িতে সাউন্ড বক্স ও মাইক সেট বাজানো হলে ঈদগাহ, মসজিদ ও কবরস্থানের সব কার্যকলাপ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হবে। মসজিদের উন্নয়নে তাদের থেকে কোনো সহায়তা নেওয়া হবে না। কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এককথায় সামাজিকভাবে তাদের বর্জন করা হবে।

খতিব ওয়ালীউল্লাহ ফরিদীর ভাষ্য, কোরআনে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু সম্প্রতি কিছু বিয়ে, সুন্নতে খতনা উপলক্ষে বাড়িতে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়েছে। এতে অসুস্থ মানুষসহ সবার স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সাউন্ড বক্স, মাইক সেট নিষিদ্ধ নিয়ে মসজিদ কমিটির এমন ঘোষণায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শুক্রবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জুমার নামাজের পর মসজিদে আবারও বৈঠক হয়েছে। বিয়ে, সুন্নতে খতনা ইত্যাদি উপলক্ষে উচ্চ শব্দের জন্য যেন নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা এবং অসুস্থ মানুষের সমস্যা না হয়, সে জন্য সাউন্ড বক্স বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা ছাড়া একটি নির্দিষ্ট স্থানে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান করতে কোনো বাধা নেই।

গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে জমারত আলী ও রুপা খাতুন দম্পতির বাড়ি। তাঁদের এতিম নাতি আলিফের (৭) শখ মেটাতে তার খতনা অনুষ্ঠানে ঈদের পরের বৃহস্পতিবার বাড়িতে সাউন্ড বক্স বাজানো হচ্ছিল। এতে মুসল্লিরা অস্বস্তি বোধ করলে সাউন্ড বক্স বাজানো বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটলে পরদিন শুক্রবার আলোচনা সাপেক্ষে গ্রামে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় মসজিদ কমিটি।

এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলে রুপা খাতুন বলেন, ‘নাতির শখ পূরণ করতে খতনা অনুষ্ঠানে মাত্র এক দিন বক্স বাজানো হয়েছে। তবে নামাজ ও আজানের সময় বন্ধ ছিল। সব সময় সাউন্ডও কম থাকত। তবু শত্রুতা করে মসজিদ কমিটির কিছু লোক প্রভাব দেখিয়ে গ্রামে ঝৈঝামেলা করতেছে।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। কেউ সাউন্ড বক্স ও মাইক সেট অতিরিক্ত শব্দে বাজালে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সচেতন করা যেতে পারে। অথবা প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এভাবে মাইকিং করে বন্ধ করা ঠিক নয়।

বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের সভাপতি আমির হোসেন বলেন, সব ধরনের গানবাজনা বন্ধ বিষয়টি ঠিক ও রকম নয়। উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ও মাইক বাজানো বন্ধের বিষয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কী প্রচারিত হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেছেন।

বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসন থেকে এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।

কুমারখালীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস বলেন, ‘প্রত্যেকটা মানুষ স্বাধীন। আমরা কারও ওপর কিছু চাপায় দিতে পারি না। এটা বন্ধ করার আইন-এখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। প্রত্যেকটা ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি নিজস্ব চেতনা আছে। এটা সৃষ্টির শুরু থেকেই আছে। সুতরাং বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

Read full story at source