‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ থেকে করুণ মৃত্যু, রাহুলের ‘অসমাপ্ত’ গল্প
· Prothom Alo

২০০৮ সালে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ মুক্তির পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, সঙ্গে কপাল খুলে যায় ছবির নায়ক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অনেকেই ভেবেছিলেন, আর দশটা বাণিজ্যিক সিনেমার নায়কের মতোই রাহুল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধারার সিনেমায় অভিনয়, লেখালেখি আর হালের পডকাস্ট দিয়ে বারবার দর্শকদের চমকে দিয়েছেন তিনি। গত রোববার পশ্চিমবঙ্গের এই অভিনেতার করুণ মৃত্যু হয়েছে, সে খবর এতক্ষণে অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। মৃত্যুর পর থেকে রাহুলের জীবন ও ক্যারিয়ার নতুন করে আলোচনায়। তাঁর জীবনকে যদি এক শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, সেটি হবে—‘অসমাপ্ত’। কিন্তু এই অসমাপ্ততাতেই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় পূর্ণতা লুকিয়ে।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়আমি পারফেক্ট নই। সম্পর্ক ভাঙার পেছনে আমারও দোষ আছে। কিন্তু আমি শিখেছি।মঞ্চ থেকে ক্যামেরার সামনে
১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর জন্ম রাহুলের। বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাট্যব্যক্তিত্ব। বলা চলে যেন রক্তে অভিনয় তাঁর। অভিনেতার বাবার থিয়েটারের দল ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’। সেখানেই প্রথমবার থিয়েটারে হাতেখড়ি। বয়স তখন মোটে তিন বছর। ‘রাজদর্শন’ নাটকে প্রথমবার আত্মপ্রকাশ। স্কুল ও কলেজজীবনেও অভিনয় থেকে কখনো দূরত্ব তৈরি হয়নি তাঁর। নাকতলা হাইস্কুলের প্রাক্তনী। আশুতোষ কলেজ থেকে স্নাতক। মঞ্চ তাঁকে শিখিয়েছিল শৃঙ্খলা, সংলাপের গভীরতা আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার কৌশল। বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ছোট নাট্যদলে কাজ করতে করতে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, এটাই তাঁর পথ। পরবর্তী সময়ে সিনেমায় সুযোগ আসে। আর সেই সুযোগই বদলে দেয় তাঁর জীবন।
Visit afsport.lat for more information.
বড় পর্দায় আসার আগেই ছোট পর্দায় অভিনয়। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’তে আদিত্যর চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে। সবার মধ্যে নজর কেড়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে একাধিক ধারাবাহিকে কাজ করেছেন রাহুল। ‘দেশের মাটি’ ধারাবাহিকের রাজা চরিত্রের হাত ধরে বাঙালি দর্শকদের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে গিয়েছিলেন অভিনেতা।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়সেই সময়টা অবিশ্বাস্য ছিল। রাস্তায় বেরোলেই মানুষ চিনত। কিন্তু আমি ভেতরে–ভেতরে ভয় পেতাম—আমি কি এই জায়গাটা ধরে রাখতে পারব?এক ছবিতেই তারকা
২০০৮ সালে মুক্তি পায় ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’। এই একটি ছবিই তাঁকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এ ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল সহজ, আন্তরিক আর বাস্তব। দর্শক তাঁকে নিজের মানুষ মনে করেছিলেন। তখনকার তরুণ-তরুণীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ভালোবাসার প্রতীক। ছবিতে নায়কের ভূমিকায় দেখা যায় তাঁকে। ধনী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে গ্যারেজে কাজ করা ছেলের প্রেমকাহিনি সাড়া ফেলে দিয়েছিল। রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত প্রথম ছবি দুর্দান্ত সাফল্যের মুখ দেখেছিল। রাহুলের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ পরিচালক। এ ছবির জন্য একসময় একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।
রাহুল একবার স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, ‘সেই সময়টা অবিশ্বাস্য ছিল। রাস্তায় বেরোলেই মানুষ চিনত। কিন্তু আমি ভেতরে–ভেতরে ভয় পেতাম—আমি কি এই জায়গাটা ধরে রাখতে পারব?’ এ প্রশ্নই যেন তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে ছায়া হয়ে ছিল।
ওই ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে কাজ করেছিলেন রাহুল। দুজনের জুটি সে সময় সবার মন কেড়েছিল। রিল থেকে রিয়েল লাইফেরও জুটি হয়ে যান দুজন। মন দেওয়া–নেওয়া থেকে প্রেম। পরবর্তীকালে ২০১০ সালে সাত পাকে ঘোরা। বর্তমানে সংসার করছেন দুজন। রয়েছে বছর বারোর সন্তান সহজ। মাঝে সম্পর্কের অবনতি হয় দুজনের। যদিও ছেলের কথা ভেবে আবার এক ছাদের তলায় দিব্যি সুখে সংসার করছিলেন তাঁরা।
সাফল্যের পরের নিঃসঙ্গতা
অনেক অভিনেতার মতোই, প্রথম সাফল্যের পর রাহুলের পথটা সহজ ছিল না। একের পর এক কাজ এলেও সব সমানভাবে সফল হয়নি। ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি, স্ক্রিপ্টের সীমাবদ্ধতা আর নিজের পছন্দ—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার বারবার বাঁক নিয়েছে। তিনি কখনোই ‘সেফ’ খেলেননি। তাঁর নিজের কথায়, ‘আমি যদি শুধু জনপ্রিয়তার পেছনে দৌড়াতাম, হয়তো অন্য রকম ক্যারিয়ার হতো। কিন্তু আমি চরিত্র খুঁজি, গল্প খুঁজি।’
এই খোঁজ তাঁকে হয়তো বড় তারকা বানায়নি, কিন্তু তাঁকে আলাদা করেছে।
সিনেমার দৃশ্যে রাহুল। আইএমডিবিটেলিভিশন ও বহুমাত্রিক উপস্থিতি
সিনেমার পাশাপাশি ছোট পর্দায়ও রাহুল ছিলেন সক্রিয়। ধারাবাহিক, টেলিফিল্ম—সবখানেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন। তাঁর অভিনয়ে একটা স্বাভাবিকতা ছিল, যা দর্শককে টানত। একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন রাহুল। ‘জ্যাকপট’, ‘লভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’-এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন রাহুল। নাটকের মঞ্চে পরিচালক সৌরভ পালোধীর পরিচালনায় ‘যে জানালাগুলো আকাশ ছিল’ নাটকেও সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন রাহুল। ৪৫০টির বেশি স্টেজ শো করেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি একের পর এক ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছেন রাহুল। ‘কালি’, ‘পাপ’, ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’-এর মতো ওয়েব সিরিজে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। শেষবার ‘ঠাকুমার ঝুলি’ ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেছেন রাহুল। অভিনেতার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন শ্রাবন্তী। নায়ক-নায়িকা কাজ করা হলো না বলে আক্ষেপও করেছিলেন তিনি।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়সবাই ভালো থাকতে চায়, কিন্তু কেউ ভালো থাকার কাজটা করতে চায় না। আমি ভালো নেই—এই কথাটা বলাটাই প্রথম সাহস।ভালোবাসা, ভাঙন এবং বাস্তবতা
রাহুলের ব্যক্তিগত জীবন তাঁর অভিনয়ের মতোই আলোচিত। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরু হয় কাজের সূত্রে। প্রেম, বিয়ে—সবকিছুই যেন এক রূপকথা। কিন্তু সেই রূপকথা বেশি দিন টেকেনি। বিচ্ছেদের পর রাহুল ভেঙে পড়েছিলেন, এ কথা তিনি লুকাননি। বরং প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি পারফেক্ট নই। সম্পর্ক ভাঙার পেছনে আমারও দোষ আছে। কিন্তু আমি শিখেছি।’
এ স্বীকারোক্তিই রাহুলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। তাঁদের সন্তানকে ঘিরে তাঁর আবেগ ছিল প্রবল। তিনি বলতেন, ‘বাবা হওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।’
হঠাৎ পানিতে তলিয়ে গেলেন রাহুল! কী ঘটেছিল গতকালএকাকিত্বের সঙ্গে লড়াই
বিচ্ছেদের পর রাহুলের জীবনে একাকিত্ব বড় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই একাকিত্ব থেকেই জন্ম নেয় তাঁর নতুন সত্তা। তিনি নিজের ভেতরের কথা বলা শুরু করেন—পডকাস্টে, লেখায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়। রাহুলের পডকাস্ট ছিল আলাদা। সেখানে কোনো সাজানো কথা ছিল না। ছিল একদম খোলামেলা স্বীকারোক্তি। তিনি কথা বলতেন সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক স্বাস্থ্য, একাকিত্ব নিয়ে। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা পুরুষরা কাঁদি না—এই ধারণাটা ভুল। আমরা কাঁদি, কিন্তু লুকিয়ে।’
অভিনেতা রাহুলের বাইরে আরেকজন রাহুল ছিলেন—লেখক। তাঁর লেখায় ছিল আত্মসমালোচনা, সম্পর্কের বিশ্লেষণ আর জীবনের ছোট ছোট উপলব্ধি।
রাহুলের একটি জনপ্রিয় লাইন ছিল, ‘সবাই ভালো থাকতে চায়, কিন্তু কেউ ভালো থাকার কাজটা করতে চায় না।’ বাংলা বিনোদনজগতে খুব কম মানুষই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এত খোলামেলা কথা বলেছেন। রাহুল সেই ব্যতিক্রম। তিনি নিজের ডিপ্রেশন, উদ্বেগ—সবকিছুই স্বীকার করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি ভালো নেই—এই কথাটা বলাটাই প্রথম সাহস।’
পানিতে ডুবে মারা গেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুলসম্পর্ক নিয়ে তাঁর দর্শন
রাহুল ভালোবাসাকে কখনোই সহজভাবে দেখেননি। তাঁর কাছে ভালোবাসা ছিল জটিল, পরিবর্তনশীল। একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা মানে অধিকার নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের মতো থাকতে দেওয়া। আমরা কেউই পুরোপুরি ঠিক নই। কিন্তু আমরা চেষ্টা করি, এই চেষ্টাটাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।’
যে শুটিংয়ে সব শেষ
গতকাল রোববার ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়েই সব শেষ। তালসারিতে সমুদ্রে নেমে মৃত্যু অভিনেতার। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। যদিও ময়নাতদন্তের পর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। আচমকা এহেন দুঃসংবাদ যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁর সহ–অভিনেতারাও। রাহুলের সঙ্গে তালসারিতে শুটিং করেন অভিনেত্রী সোমাশ্রী চাকি। ধারাবাহিকে রাহুলের মেজ জেঠিমার চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। তিনি এক সংবাদমাধ্যমে শেষবার কথোপকথনের কথা জানান। অভিনেত্রী বলেন, ‘আমাদের প্যাকঅ্যাপ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের আজই কলকাতায় ফেরার কথা ছিল। রাস্তায় খবরটা পাই। আজও একসঙ্গে ছবি তুললাম। ওদের আগামীকাল ফেরার কথা ছিল। বলল, আমাদের তো আর দেখা হবে না। কথাটাই যে সত্যি হয়ে যাবে, বুঝিনি।’
আনন্দবাজার, সংবাদ প্রতিদিন, এই সময় অবলম্বনে