এখনই হয়তো বন্ধ হচ্ছে না আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন, নাসার নতুন পরিকল্পনা
· Prothom Alo

আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন বা আইএসএসকে চিরতরে বিদায় জানানোর দিন বেশ ঘনিয়ে আসছিল। নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালেই এর অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা এই সিদ্ধান্তে বাগড়া দিয়েছেন! মার্কিন সিনেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি চাইছে, এখনই যেন পুরোনো এই মহাকাশ স্টেশনটিকে ধ্বংস করা না হয়। তাদের এই প্রস্তাব যদি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়, তাহলে তা মানুষের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
Visit catcross.org for more information.
সম্প্রতি মার্কিন সিনেটের কমিটি অন কমার্স, সায়েন্স অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন তাদের নাসা অথোরাইজেশন অ্যাক্ট অফ ২০২৬-এর খসড়ায় একটি নতুন প্রস্তাব যোগ করেছে। এই প্রস্তাবে নাসাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন আইএসএসের কার্যক্রম অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত চালিয়ে যায়। অর্থাৎ বর্তমান পরিকল্পনার চেয়ে আরও দুই বছর বেশি। শুধু তা-ই নয়, খসড়ায় কঠোরভাবে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে—যতক্ষণ না বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি কোনো বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন পুরোপুরি কাজ শুরু করছে, ততক্ষণ নাসা কোনোভাবেই আইএসএসকে কক্ষপথ থেকে নামিয়ে ধ্বংস করতে পারবে না।
জানেন হয়তো, মহাকাশ অভিযানের একটি অন্যতম অপ্রিয় সত্য হলো, আইএসএস এখন বেশ পুরোনো হয়ে গেছে এবং এর আয়ু ফুরিয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল, আর ২০০০ সালের নভেম্বর মাস থেকে এখানে মানুষ টানা বসবাস ও গবেষণা করে আসছে। কিন্তু মহাকাশের পরিবেশ ভীষণ বৈরী এবং বিপজ্জনক।
আইএসএস এখন বেশ পুরোনো হয়ে গেছে এবং এর আয়ু ফুরিয়ে আসছেএত বিশাল একটি স্টেশন যত বেশি দিন কক্ষপথে থাকবে, কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিপর্যয়ের ঝুঁকি ততই বাড়তে থাকবে। আর মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এই বিশাল কাঠামোটি সরাসরি পৃথিবীর বুকেই আছড়ে পড়তে পারে।
মহাকাশে নতুন রেকর্ড গড়ল আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল, আর ২০০০ সালের নভেম্বর মাস থেকে এখানে মানুষ টানা বসবাস ও গবেষণা করে আসছে।
বর্তমানে নাসা এবং এর আন্তর্জাতিক অংশীদাররা আশা করছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত এটিকে নিরাপদে টিকিয়ে রাখা যাবে। এরপর স্টেশনটির সলিল সমাধি ঘটবে। এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ২০২৪ সালের জুনে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সঙ্গে ৮৪৩ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও করে রেখেছে নাসা। স্পেসএক্সের দায়িত্ব হলো তাদের ড্রাগন মহাকাশযানের একটি শক্তিশালী সংস্করণ তৈরি করা, যা ২০৩১ সালে আইএসএসকে নিরাপদে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে পারবে। এমন একটি জটিল কাজের জন্য সময়টাও কিন্তু বেশ কম। কারণ সামান্য ভুলে পৃথিবীর বুকে মহাকাশ স্টেশনের ধ্বংসাবশেষের বৃষ্টি ঝরতে পারে!
স্পেসএক্সের ড্রাগন মহাকাশযানএই ধ্বংসের পর নভোচারীরা কোথায় যাবেন? নাসা বেশ কিছুদিন ধরেই বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে নতুন মহাকাশ স্টেশন বানাতে সাহায্য করছে। উদাহরণস্বরূপ, নাসা আগে বিগেলো অ্যারোস্পেসের সঙ্গে কাজ করেছিল, আর এখন অ্যাক্সিওম স্পেসকে একটি নতুন স্টেশন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু আইএসএসের আয়ু যেমন বারবার বাড়ানো হয়েছে, ঠিক তেমনি এই নতুন বাণিজ্যিক স্টেশনগুলোর তৈরি হওয়ার সময়সীমাও বারবার পিছিয়েছে।
সিনেট কমিটি, বিশেষ করে এর দুই নেতা রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর মারিয়া ক্যান্টওয়েল এই বিলটির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটু ত্বরান্বিত করতে চাইছেন। বিলটিতে বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন তৈরির জন্য একটি আক্রমণাত্মক সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, নাসাকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন স্টেশনের প্রয়োজনীয় শর্তাবলি প্রকাশ করতে হবে, ৯০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রস্তাবনা চাইতে হবে এবং ১৮০ দিনের মধ্যে অন্তত দুটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে যেতে হবে। সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, নতুন স্টেশন কাজ শুরু না করা পর্যন্ত পুরোনোটিকে কোনোভাবেই ধ্বংস করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে ধ্বংস না করে মহাকাশে মিউজিয়াম বানালে কেমন হতোস্পেসএক্সের দায়িত্ব হলো তাদের ড্রাগন মহাকাশযানের একটি শক্তিশালী সংস্করণ তৈরি করা, যা ২০৩১ সালে আইএসএসকে নিরাপদে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে পারবে।
নাসা এবং মার্কিন আইনপ্রণেতারা দীর্ঘদিন ধরেই ভয়ে আছেন। আইএসএস ধ্বংস হয়ে গেলে নিম্ন কক্ষপথে দীর্ঘমেয়াদি মানব অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আর কোনো জায়গাই থাকবে না। বর্তমানে মহাকাশে আইএসএস ছাড়া একমাত্র সক্রিয় স্টেশন হলো চীনের তিয়ানগং। এটি ২০২১ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
মহাকাশে আইএসএস ছাড়া একমাত্র সক্রিয় স্টেশন হলো চীনের তিয়ানগংসব মিলিয়ে পরিস্থিতি যা দাঁড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই নিজেদের মহাকাশ স্টেশনটির ওপর থেকে অধিকার ছাড়তে মোটেও প্রস্তুত নয়। কারণ মহাশূন্যের এই প্রতিযোগিতায় একবার নিম্ন কক্ষপথের দখল হারালে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করা যে কতটা কঠিন হবে, তা তারা খুব ভালো করেই জানে!
লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুরসূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানবন্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন, এরপর নভোচারীরা কোথায় থাকবেন