আমরা করব জয়
· Prothom Alo

আমি অদিতি। কালকে আমার ১৮তম জন্মদিন। ডায়েরি লেখা আমার ছোটবেলা থেকে অভ্যাস। প্রতিবছর আমার জন্মদিনের দিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। আমার কী যে আনন্দ লাগে। সেই আনন্দের ভাগটুকু আজকে তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেব। কালকের দিনটি আমি কাজ করব না, রোববার, ছুটির দিন, স্কুলও নেই। তাই একটা দিন শুধু আমার। তোমরা ভাবছ, এ সময়ে এ বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে কেন ঘুরে বেড়াচ্ছি না? তাহলে শোনো আমার জীবনের গল্প। শুধু এক বছর আগের একটা ঘটনা বদলে দিয়েছে আমার জীবনের সমীকরণ। আমি অনেক বড় হয়ে গিয়েছি এই এক বছরে। দুঃখ ভুলে আবারও মনে হচ্ছে, হাসতে পারব আমি।
Visit fishroad-app.com for more information.
আমার জন্ম আমেরিকার সানদিয়েগো শহরে। শহরটা ভীষণ সুন্দর কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন তেমন সুবিধার নয়। মানে বাস বা ট্রেনে করে সব যায়গায় যাওয়া যায় না। এ শহরে আমাদের আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। আমার জন্মের আগে মা–বাবা বেড়াতে এসে এ শহরের প্রেমে পড়ে যান। থেকে যান তাঁরা, বহু কষ্টে গ্রিন কার্ড জোগাড় করেন, তারপর সিটিজেনশিপ। বাবা দোকানে কাজ করে সংসার চালাতেন। আমার ১০ বছর বয়সে একটা ভাই হলো। আমাদের দিনকাল ভালোই চলছিল। মা আমাদের দেখতেন, স্কুল থেকে আনা–নেওয়া করতেন আর বাবা কাজ করতেন। কোনো কোনো ছুটির দিনে আমরা আশপাশের পার্কে বেড়াতে যেতাম। মাঝেমধ্যে সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতাম।
জান দিয়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করে বাসাভাড়া আর নিজেদের খাবারের পয়সা জোগাড় করা শুরু করলাম আমি অদিতি। মা সারা দিন কাঁদেন, ছোট ভাইটা মন মরা হয়ে ঘোরে, দুই সপ্তাহ পরে বেতন পেয়ে বুঝে গেলাম, আমরা পারব বেঁচে থাকতে। ক্লাস শুরু হলে কষ্ট হবে, তবু পারতে যে আমাকে হবেই। চার মাস পর ক্লাস শুরু হলো, কী অক্লান্ত পরিশ্রম আমি করেছি। মাঝেমধ্যেই মনে হতো বসে থাকি, আর যাব না কোথাও। কিন্তু হাসিমুখে রেডি হয়ে চলে যাই। বাবাকে ভীষণ মিস করি, গোপনে কাঁদি কিন্তু মা দেখেন না। কয়েক মাস পরেই দেখলাম, মা একটু একটু সামলে নিচ্ছেন। ছয় মাস পরে বললেন, তোর ভাই এর স্কুলে কাজ নিয়েছি অদিতি। তোকে আর ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হবে না। দুজনের টাকায় সংসার চলবে এখন থেকে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সেদিন অনেক কেঁদেছি বাবাকে মনে করে। আমার জন্মের সময় নাকি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন তিনি। বলতেন, আমার মেয়ে হয়েছে, ল ইয়ার হবে। সব দুঃখী মেয়েদেরও সহায় হবে। আমি পারব। দোয়া করো বাবা।
আমার ১৭ বছরের জন্মদিনের মাত্র ১০দিন বাকি। বাবা বাসায় আসছেন না। মা রান্না শেষ করে একটু চিন্তিত মুখে বললেন, তোমার বাবা তো দেরি করেন না, কী হলো কে জানে। ফোন ধরছে না, হয়তো চার্জ নেই ফোনে। প্রায় রাত ১০টার দিকে বাসায় কলিং বেল বাজল। মা দৌড়ে গেলেন। দরজা খুলে দেখেন, পুলিশ! আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে। গেলাম। গিয়ে দেখলাম, বাবা আর নেই। বাস থেকে নেমে হেঁটে ফেরার সময় কোনো এক গাড়ি চাপা দিয়ে চলে গেছে। পরে ওরা হাসপাতালে এনেছে কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। বাবা নেই , বাসার একটু দূরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন, আমরা জানতাম না। মা কাঁদছেন আমাকে জড়িয়ে, একটু পর ছোট ভাইটাও আমাকে জড়িয়েই কান্না শুরু করল। তার পরের কয়েক দিন দুঃস্বপ্নের মতো কেটে গেল। বাবাকে কবর দিয়ে এসে চোখ মুছে বসলাম নিজের কমিউনিটি কলেজের অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে। সঙ্গে কাজ নিলাম পাশের স্টারবাকসে। কীভাবে সবকিছু পেরেছি, আমি জানি না। স্কুলের একজন শিক্ষক ভীষণ সাহায্য করলেন, মিস রোজি। তিনি লাইব্রেরি থেকে অ্যাপ্লিকেশন প্রিন্ট করে দিলেন। স্টারবাকসে নিজে গেলেন সঙ্গে। বললেন, অদিতি, হাল ছেড়ো না মেয়ে, তোমাকে পারতে হবে।
আব্বু এর বেশি ভালোবাসা যায় নাফিরে এলাম বাস্তবে। ১১.৫৫ মিনিটে কিছু ফিসফাস শুনলাম কিচেনে। তারপর একটা কেক, সঙ্গে বেলুন আর মোমবাতি নিয়ে গান গাইতে গাইতে মা আর ভাই এলেন। মা বললেন, মামনি শুভ জন্মদিন। বিশ্ব নারী দিবসে যে রাজকন্যা আমার ঘর আলো করে এসেছে, তার সব স্বপ্ন সত্যি হোক। আমি বললাম, মা কত কত নারী আমাদের পথ দেখিয়েছেন আকাশসম স্বপ্ন দেখার। মা দোয়া করো যেন তাঁদের মতো আলোকিত মানুষ হতে পারি। আজকের মতো ডায়েরি লেখা শেষ করি কেমন? কেক কাটব, খাব, এক বছর পর আমরা আবার সমুদ্রের পাড়ে যাব, বালু দিয়ে স্যান্ড ক্যাসেল বানাব। তোমরাও স্বপ্ন দেখা বন্ধ কোরো না কিন্তু। আর যাঁদের ক্ষমতা আছে, তাঁরা আমাদের জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিয়ে যেয়ো। কারণ…
আমরা করব জয়
আমরা করব জয় একদিন
ভালোবাসা, যার আর কোনো নাম নেই