দুর্বল ইরান আমেরিকার জন্যই বুমেরাং হতে পারে

· Prothom Alo

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো সামরিক অভিযানকে যাঁরা সমর্থন করেন, তাঁরা একটি সরল যুক্তি সামনে আনেন। সেটি হলো—তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে দুর্বল করা, নৌবাহিনীকে অক্ষম করে দেওয়া এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কমিয়ে দিলে মধ্যপ্রাচ্য আরও নিরাপদ হবে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এই যুক্তির ভিত্তি যে অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো—দুর্বল ইরান মানেই আরও স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর একটি যদি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এমন কিছু শক্তি মুক্ত হয়ে যেতে পারে, যা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক হবে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেসের কর্মীদের দেওয়া ব্রিফিং অনুযায়ী, এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল। তবু সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে—এই বিশ্বাসে যে ইরানকে দুর্বল করা শেষ পর্যন্ত আমেরিকার স্বার্থেই কাজে দেবে। কিন্তু যদি এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে তার ফলাফল শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের জন্যও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

ইরান কি মাথা নোয়াবে?

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—অভ্যন্তরীণ ভাঙন। ইরান একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। পারসিয়ানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আজেরি, কুর্দি, আরব এবং বালুচ জনগোষ্ঠী বসবাস করে। এই গোষ্ঠীগুলোর কিছু কিছু অঞ্চলে আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বা বিদ্রোহের ইতিহাস রয়েছে। উত্তর-পশ্চিমে কুর্দি সশস্ত্র কার্যকলাপ এবং দক্ষিণ-পূর্বে দীর্ঘদিনের বালুচ বিদ্রোহ তার উদাহরণ।

এখন পর্যন্ত একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এই বিভাজনরেখাগুলোকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু যদি রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে এই চাপা উত্তেজনা দ্রুত বিস্ফোরিত হতে পারে। তখন পরিস্থিতি এমন এক ভাঙনের দিকে যেতে পারে, যেমনটি সাম্প্রতিক সময়ে বহিরাগত সামরিক চাপ বা শাসনব্যবস্থার পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক ইতিহাস এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা দেয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ করার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছিল। তার ফল হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং শেষ পর্যন্ত আইএস-এর উত্থান। ২০১১ সালে লিবিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর দেশটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। সে সংকট আজও শেষ হয়নি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শতাব্দীর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি তৈরি করেছে এবং বিশাল ভূখণ্ডকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জঙ্গিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। সংঘাতের একপর্যায়ে আইএসআইএস পূর্ব সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তথাকথিত খিলাফত ঘোষণা করেছিল এবং লাখো মানুষের ওপর শাসন চালিয়েছিল।

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে—রক্ষণশীল ধর্মীয় নেটওয়ার্ক, সংস্কারপন্থী রাজনীতিক এবং নিরাপত্তাকাঠামোর প্রভাবশালী অংশ, যেমন ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তন কোনো একক উত্তরসূরির বিষয় নয়; বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে।

ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ইরানের জনসংখ্যা ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। তার ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত সংবেদনশীল। তার অনেক সীমান্তে সংঘাতপ্রবণ এলাকা আছে। যদি ইরানের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠী, জাতিগত মিলিশিয়া বা বিদ্রোহী শক্তি মাথা তোলে, তাহলে দেশটি দ্রুত দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এই অস্থিতিশীলতা শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ইরান পারস্য উপসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালি ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছেই। যদি ইরানের উপকূলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া বা নিয়ন্ত্রণহীন নৌবাহিনী সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে তারা সহজেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে, তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালাতে পারে, এমনকি প্রণালি অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। এতে আঞ্চলিক সংকট দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে রূপ নিতে পারে।

এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার অভিঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির সর্বত্র পড়বে—পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে মূল্যস্ফীতি পর্যন্ত। অনেক সময় আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা জ্বালানি অস্থিতিশীলতাকে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এটি খুব দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়।

ইরান আঞ্চলিক শত্রু মোকাবিলায় অভিনব কৌশল রপ্ত করেছে

কৌশলগত পরিণতিও এখানেই থেমে থাকবে না। বর্তমানে ইরান একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক জোট ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। এর মধ্যে লেবাননে রয়েছে হিজবুল্লাহ, ইরাকে আছে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনে আছে হুতি গোষ্ঠী। এরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো মাত্রায় তেহরানের প্রভাববলয়ে কাজ করে।

কিন্তু যদি ইরানি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে এই কাঠামোও ভেঙে যেতে পারে। কিছু গোষ্ঠী স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করতে পারে, কেউ কেউ প্রভাব বিস্তারের জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে, আবার কেউ কেউ কেন্দ্রীয় সমন্বয় ছাড়াই আরও চরমপন্থী হয়ে উঠতে পারে। তখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। এটি কূটনৈতিক সমাধানকে কঠিন করে তুলবে এবং সামরিক সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা। কিছু নীতিনির্ধারক মনে করেন, বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে বা অপসারিত হলে সেখানে একটি তুলনামূলক উদার রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলে, শাসন পরিবর্তন খুব কম ক্ষেত্রেই পূর্বনির্ধারিত পথে এগোয়।

ইরান কি মাথা নোয়াবে?

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে—রক্ষণশীল ধর্মীয় নেটওয়ার্ক, সংস্কারপন্থী রাজনীতিক এবং নিরাপত্তাকাঠামোর প্রভাবশালী অংশ, যেমন ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তন কোনো একক উত্তরসূরির বিষয় নয়; বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে।

যদি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বর্তমান নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে বা অপসারিত হয়, তাহলে এই ভারসাম্য দ্রুত ভেঙে যেতে পারে। বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী আইআরজিসি তখন ক্ষমতা আরও দৃঢ়ভাবে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করতে পারে। ফলে ইরান আরও প্রকাশ্য সামরিকীকৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে এমন শক্তির উত্থানও ঘটতে পারে, যারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতাই সম্ভব নয়।

এটাও মনে রাখার মতো যে ধারাবাহিক সামরিক হামলা ইরানের জনগণের মধ্যে আমেরিকাপন্থী মনোভাব তৈরি করবে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং ইতিহাস দেখায়, বাইরের চাপ অনেক সময় জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ আমেরিকার প্রতি সহানুভূতি তৈরি করেনি; বরং ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে উসকে দিয়েছিল। একইভাবে লেবাননে ইসরায়েলের বারবার সামরিক অভিযান হিজবুল্লাহর সমর্থন কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে তা বাড়িয়েই দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে—অভিবাসন সংকট। ইরান ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে আসা লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যদি ইরানের ভেতরেই সংঘাত শুরু হয়, তাহলে ৯ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে সামান্য অংশ মানুষও যদি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তাহলে তা সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো শরণার্থী সংকটের চেয়েও বড় ঢেউ তৈরি করতে পারে।

এই শরণার্থীদের বড় অংশ সম্ভবত প্রথমে তুরস্কের দিকে যাবে, সেখান থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। এতে ইউরোপের সরকারগুলোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হবে—যারা ইতিমধ্যেই অভিবাসন সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিষয়টি হয়তো আমেরিকার ভূখণ্ড থেকে দূরের মনে হতে পারে, কিন্তু ইউরোপে এর রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পড়বে এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।

সব মিলিয়ে একটি বড় কৌশলগত সমস্যাই সামনে আসে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানকে দুর্বল করা হয়তো আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু কোনো বড় আঞ্চলিক শক্তিকে অস্থিতিশীল করে দিলে তার ফল খুব কম ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলাপূর্ণ হয়।

সুতরাং ওয়াশিংটনের সামনে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—ইরানকে অস্থিতিশীল করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি কি সত্যিই অঞ্চল এবং বিশ্বকে আরও নিরাপদ করবে?

  • আলেকজান্ডার ক্ল্যাকসন লন্ডনভিত্তিক গ্লোবাল পলিটিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source