আমরা খুঁজব, আমরা পাব
· Prothom Alo

মার্চে যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা; ডিসেম্বরে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটে। সদ্য স্বাধীন দেশে শত্রু পরিবেষ্টিত অঞ্চলে বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান। তাঁকে নিয়ে আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম নামের একটি সিনেমা বানিয়েছেন নাঈম মোহায়মেন। আর সেই সিনেমার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমেছেন জহির রায়হানের মন ও চলচ্চিত্র এবং আমাদের বর্তমান নিষ্করুণ বাস্তবতার গহনে।
Visit hilogame.news for more information.
২০১৫ সালে ভারতের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় (এফটিআইআই) এক বিতর্কিত ব্যক্তিকে ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে তুমুল আন্দোলন গড়ে ওঠে। সেই ছাত্র আন্দোলনে জ্বালাময়ী এক স্লোগান উচ্চারিত হয়, ‘আইজেনস্টাইন, পুদভকিন/ উই শ্যাল ফাইট, উই শ্যাল উইন’ (আইজেনস্টাইন, পুদভকিন/ আমরা লড়ব, আমরা জিতব)। স্লোগানটির মাধ্যমে ছাত্ররা সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার সের্গেই আইজেনস্টাইন ও সেভেলদ পুদভকিনের নাম স্মরণ করছিলেন, যাঁরা ১৯৩০-এর দশকের বিপ্লবী সিনেমার ধারণা প্রস্তাব করেন।
এই স্লোগান অন্য এক ছন্দে ফিরে আসে আশিস রাজাধ্যক্ষের বই জন–ঘটক–তারকোভস্কি: সিটিজেনস, ফিল্মমেকার্স, হ্যাকার্স-এর (তুলিকা, ২০২৩) শিরোনামে। বইটিতে আছে ভারতের সরকারি চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটের ইতিহাস-রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শুদ্ধিকরণ অভিযান বনাম প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি। বইয়ের শিরোনামের প্রথম দুই নাম—জন আব্রাহাম ও ঋত্বিক ঘটক—তৃতীয় সিনেমা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। ভারতের বিভিন্ন ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দেয়ালে তাঁদের দুজনের ম্যুরাল একটি পরিচিত দৃশ্য (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগেও ঋত্বিক ঘটকের একটি ম্যুরাল আছে)। কিন্তু এই গৌরবময় স্মৃতিচিহ্নগুলোর পাশেই রয়েছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা: ফিল্ম স্কুলগুলো ক্রমশ নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আটকে যাচ্ছে। সিনেমার মৌলিক বিপ্লবী সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে।
জহির রায়হানের উত্তরাধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জন-ঘটক-তারকোভস্কি ত্রয়ীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (এফডিসি) প্রথম তলার সিঁড়িতে জহির রায়হানের প্রতিকৃতি থাকলেও আমাদের বর্তমান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাঁর বিপ্লবী সিনেমা-প্রকল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে না। আমার নতুন চলচ্চিত্র আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ (২০২৫) অনুপস্থিত জহির রায়হানের সঙ্গে আমি একধরনের সংলাপ নির্মাণের চেষ্টা করেছি। ছবির একটি দৃশ্যে ক্যামেরা এফডিসির সিঁড়ি বেয়ে জহির রায়হান ও সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতির পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে। কিছুটা এগিয়ে আবার ক্যামেরা হঠাৎ থামে। তারপর নিজেই পেছন দিকে হাঁটা দেয়। পর্দায় লেখা ভেসে ওঠে—সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে ‘বিদ্রোহী’ ঋত্বিক ঘটক হয়তো জহির রায়হানের সঙ্গে অধিকতর যথার্থ যুগল হতে পারতেন।
আমার নতুন চলচ্চিত্র আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ (২০২৫) অনুপস্থিত জহির রায়হানের সঙ্গে আমি একধরনের সংলাপ নির্মাণের চেষ্টা করেছি। পর্দায় লেখা ভেসে ওঠে—সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে ‘বিদ্রোহী’ ঋত্বিক ঘটক হয়তো জহির রায়হানের সঙ্গে অধিকতর যথার্থ যুগল হতে পারতেন।
এখানে দুটি ধারণা কাজ করছে। প্রথমত, জহির রায়হান বেঁচে থাকলে ১৯৭২ সালের পর বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির রূপ হয়তো একেবারেই ভিন্ন হতো। দ্বিতীয়ত, যদি তাঁর অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে আজকের এই বিকৃত ফিল্ম-পরিবেশই টিকে থাকত, তবে তিনি অবশ্যই এই ‘সেলুলয়েডের মৃত্যুপ্রান্তর’ (ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের ব্যবহৃত শব্দবন্ধ) মেনে নিতেন না। আমার ছবিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত জহির রায়হানের আনোয়ারা (১৯৬৭) চলচ্চিত্রের সেই বিভ্রমময় হত্যাদৃশ্য, যার মধ্যে আমি সের্গেই আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর (১৯২৫) ছাপ দেখি। রুশ যুদ্ধজাহাজের বিদ্রোহকে গ্রামবাংলার পারিবারিক সংঘাতে রূপান্তর করাই ছিল জহির রায়হানের আন্তর্জাতিকতাবাদী চলচ্চিত্রভাষার ইঙ্গিত।
আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম প্রথম প্রদর্শিত হয় আয়ারল্যান্ডের ইভা ইন্টারন্যাশনাল বিয়েনালেতে, এখন ভারতের কোচি-মুজিরিস বিয়েনালেতে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই যুগপৎ প্রদর্শনীর মাধ্যমে আয়ারল্যান্ড ও ভারতের দর্শককে জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড-এর (১৯৭১) আন্তর্জাতিকতাবাদী চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়েছে। ছবিটিতে আবার আছে আলমগীর কবিরের ধারাভাষ্যে আউশভিৎজ, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গের জোরালো উপস্থিতি।
গত জানুয়ারি মাসে ঢাকায় আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বেঙ্গল শিল্পালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগে। প্রদর্শনীর সময় আমি পরিচালক মোল্লা সাগরের চলচ্চিত্রের সঙ্গে একধরনের অন্তর্গত সংলাপে নিমগ্ন হয়েছিলাম। মোল্লা সাগরের নতুন ছবি ভবের ভিটা (২০২৫) ঋত্বিক ঘটকের উত্তরাধিকার অনুসন্ধানের যাত্রা। ঘটকের যমজ বোনের সঙ্গে কথোপকথনের ফাঁকে ফাঁকে ছবিটি পুরান ঢাকার ভেতর দিয়ে একধরনের ‘রোড মুভি’র যাত্রা করে। একটি গো-প্রো ক্যামেরা দিয়ে মোল্লা সাগর ঋত্বিক ঘটকের বসবাসের চিহ্ন খুঁজে ফেরেন। তাঁর এই অনুসন্ধানে বিরক্ত হন এলাকার কিছু বাসিন্দা। তাঁদের আশঙ্কা, এই ডকুমেন্টারি তাঁদের বসবাসের দাবিকে দুর্বল করে দেবে, যেহেতু অনেকেরই জমির কাগজপত্র নেই। ছবিটির শেষে আছে এক বেদনাদায়ক উপসংহার: ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ি ধ্বংস করা হয়। মোল্লা সাগরের ছবিটি দেখতে দেখতে ভাবি, জহির রায়হানের উত্তরাধিকারও নানাভাবে আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।
এত ভিন্ন মাত্রার সিনেমার কাজের ভেতরের টানাপোড়েন তাঁর মৃত্যুর পর জহির রায়হানকে একধরনের সেমিওটিক ধাঁধায় পরিণত করেছে। তাঁর নির্মাণকাজে একই সঙ্গে ছিল নিওরিয়ালিস্ট সামাজিক বাস্তবতা এবং জনপ্রিয় বিনোদন, উর্দু ও বাংলা সংলাপ, জাতীয়তাবাদী প্রকল্প ও সোভিয়েত আন্তর্জাতিকতাবাদ।
জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৪৫ দিন পর। নিখোঁজ ভাই কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে নিখোঁজ হন তিনি। বহুমুখী প্রতিভার মানুষ জহির রায়হান বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং উপন্যাস লিখেছেন, যার পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ তৈরি করা একটি অতি জরুরি কাজ। গবেষক মীর শামছুল আলম বাবুর কাজের ভিত্তিতে আমরা পেয়েছি জহির রায়হানের চলচ্চিত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা—সহকারী পরিচালক হিসেবে জাগো হুয়া সাভেরা (১৯৫৯), এদেশ তোমার আমার (১৯৫৯), প্রামাণ্যচিত্র নবারুণ (১৯৬০), যে নদী মরুপথে (১৯৬১); পরিচালক হিসেবে কখনো আসেনি (১৯৬১), কলিম শরাফীর সঙ্গে সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭), প্রামাণ্যচিত্র নয়া সড়ক (১৯৬৭), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), জ্বলতে সুরজ কা নিচে (উর্দু সংস্করণ: ১৯৭১, বাংলা ডাবিং: ১৯৭৭), স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১), আ স্টেট ইজ বর্ন (১৯৭১); প্রযোজক হিসেবে জুলেখা (১৯৬৭), দুই ভাই (১৯৬৭), সংসার (১৯৬৮), সুয়োরানী দুয়োরানী (১৯৬৮), কুঁচবরন কন্যা (১৯৬৮), মনের মত বউ (১৯৬৯), বেদের মেয়ে (১৯৬৯), শেষ পর্যন্ত (১৯৬৯), যোগ বিয়োগ (১৯৭০), লিবারেশন ফাইটার্স (১৯৭১), ইনোসেন্ট মিলিয়ন্স (১৯৭১) ও প্রতিশোধ (১৯৭২)।
এত ভিন্ন মাত্রার সিনেমার কাজের ভেতরের টানাপোড়েন তাঁর মৃত্যুর পর জহির রায়হানকে একধরনের সেমিওটিক ধাঁধায় পরিণত করেছে। তাঁর নির্মাণকাজে একই সঙ্গে ছিল নিওরিয়ালিস্ট সামাজিক বাস্তবতা এবং জনপ্রিয় বিনোদন, উর্দু ও বাংলা সংলাপ, জাতীয়তাবাদী প্রকল্প ও সোভিয়েত আন্তর্জাতিকতাবাদ। আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ আমি জহির রায়হানকে খুঁজেছি ফিল্ম আর্কাইভে এবং তাঁর পরিবারের সদস্য (কোহিনূর আক্তার সুচন্দা, ফরিদা আখতার ববিতা, তপু রায়হান, অনল রায়হান) ও গবেষকদের (মীর শামছুল আলম বাবু, মৈনাক বিশ্বাস, হাশেম সূফী) সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে। তাঁর উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমার নিজস্ব বোঝাপড়ার ভিত্তি এসব আলাপ। তবে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের অভাব, বিশেষ করে মৃত্যুকালে অসমাপ্ত ছবি এ নিয়ে পৃথিবী (১৯৭০) ও লেট দেয়ার বি লাইট (১৯৭০)—এই অনুসন্ধানকে বারবার থামিয়ে দেয়। ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে এক ভাঙাচোরা বাস্তবতার ভেতর দিয়ে, যেখানে জহির রায়হানের অনুপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বড় আঘাত। জহির রায়হানকে ঘিরে মৃত্যুর পর যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, তা এ বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। তিনি জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, কিন্তু বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এই জাতিসত্তার বর্তমান সংকুচিত অবয়বের সমালোচনা করতেন।
জহির রায়হান তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এ জে কারদারের জাগো হুয়া সাভেরাতে (১৯৫৯) সহকারী পরিচালক হিসেবে। ছবিটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম নিওরিয়ালিস্ট প্রযোজনা। পূর্ব বাংলার জেলেদের কণ্ঠে উর্দু-বাংলার এক কৃত্রিম মিশ্র ভাষায় নির্মিত এই ছবি বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়। তবে গবেষক ইফতিখার দাদি মনে করেন, ছবিটি পাকিস্তানের পরবর্তী সাংস্কৃতিক বিকাশে একধরনের ‘প্রেতাত্মাসুলভ ভূমিকা’ পালন করে। পরবর্তী সময়ে জহির রায়হান বাংলা-উর্দু দুই ভাষাতেই ছবি বানিয়েছেন—নৃতত্ত্ববিদ লোটে হুক একে বলেছেন ‘ক্রস-উইং ফিল্ম মেকিং’। পূর্ব-পশ্চিম দুই ডানার (টু উইং) পাকিস্তানি চলচ্চিত্র থেকে জহির রায়হানের সরে আসার প্রক্রিয়া বোঝার জন্য দুটি ছবি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) ও স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১)। দুটি ছবিতেই ডকুমেন্টারি ফুটেজ ও কাহিনিভিত্তিক দৃশ্য পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিছিলের নিউজ-রিল ও আলোকচিত্র ঢুকে পড়েছে চিত্রনাট্যের ফাঁকে ফাঁকে। স্টপ জেনোসাইড মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই সম্পন্ন হয়। আলমগীর কবিরের ভাষায়, গণহত্যার চলচ্চিত্র দলিলের অভাব-এর মুখে পড়েছিল (ফিল্ম ইন বাংলাদেশ, ১৯৭৯)। জহির রায়হান মন্তাজ ও সংযোজনের মাধ্যমে একধরনের ‘শিল্পীসুলভ জেদ’ নিয়ে এই অভাব পূরণ করেন। গবেষক মাহমুদুল হোসেন ধারণা করেন, জহির রায়হান থার্ড সিনেমা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং ডকুমেন্টারি ক্লিপ, নিউজ-রিল, আলোকচিত্র ও পরিসংখ্যান ব্যবহারের কৌশল সেখান থেকেই নিয়েছিলেন।
তাঁর [জহির রায়হানের] পরিকল্পনা ছিল ছবিটি [লেট দেয়ার বি লাইট] একাধিক ভাষায় নির্মাণের। ইংরেজি ও সম্ভবত রুশ ভাষায়। আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ আমি জহির রায়হানের এই সংক্ষিপ্ত সমাজতান্ত্রিক সিনেমার বংশলতিকা খুঁজতে চেয়েছি, যাকে আমি বলি ‘প্রায় জন্মানো সমাজতন্ত্র’।‘আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম’ সীমিত সময়ের জন্য অনলাইনে দেখা যাবে এই লিংকেজহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫-৩০ জানুয়ারি ১৯৭২)
মাশা সালাজকিনা তাঁর বই ওয়ার্ল্ড সোশালিস্ট সিনেমা: অ্যালায়েন্সেস, অ্যাফিনিটিজ অ্যান্ড সলিডারিটিজ ইন দ্য গ্লোবাল কোল্ড ওয়ার-এর (২০২৩) শেষ অংশে স্টপ জেনোসাইড-এর একটি নিবিড় পাঠ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, জহির রায়হানের কাজের সঙ্গে সের্গেই আইজেনস্টাইন, সান্তিয়াগো আলভারেজ ও আন্দ্রে ভাইদার মতো সমাজতান্ত্রিক চলচ্চিত্রকারদের আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর লেট দেয়ার বি লাইট ছিল সেই ছবি, যেখানে তাঁর ডাইরেক্ট সিনেমার প্রতি ঝোঁক পূর্ণতা পাওয়ার কথা ছিল। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ছবিটি একাধিক ভাষায় নির্মাণের। ইংরেজি ও সম্ভবত রুশ ভাষায়। আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ আমি জহির রায়হানের এই সংক্ষিপ্ত সমাজতান্ত্রিক সিনেমার বংশলতিকা খুঁজতে চেয়েছি, যাকে আমি বলি ‘প্রায় জন্মানো সমাজতন্ত্র’। এটি গড়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে, যেখানে কমিউনিস্ট দলগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেওয়া হয়নি।
ভারতে কাটানো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জহির রায়হান কী ধরনের সমাজতান্ত্রিক সিনেমা নির্মাণ করছিলেন, তার কিছু ইঙ্গিত আমরা পাই তাঁর যুদ্ধপূর্ব চলচ্চিত্র প্রযোজনার ভেতরে লুকানো আলামতে। ১৯৭১ সালে আলমগীর কবির ও সৈয়দ হাসান ইমামের সঙ্গে মিলে তিনি জাতীয়কৃত চলচ্চিত্রশিল্পের পরিকল্পনা খসড়া তৈরি করেছিলেন। সেই দুর্লভ খসড়া যদি স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্প-রূপরেখা হতে পারত, তাহলে একটি শক্তিশালী বিপ্লবী সিনেমা জন্মানোর সম্ভাবনা ছিল।
আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম-এ আমার নানা গবেষণাপ্রসূত দ্বিধা প্রকাশ পেয়েছে। ছবির সম্পাদনার গতি বাড়ে কেবল তখনই, যখন জহির রায়হানের নিজের ছবিগুলো সামনে আসে। কখনো এক পর্দায় তিনটি দৃশ্য একত্রে জন ফ্রাঙ্কেনহাইমারের গ্রাঁ প্রি (১৯৬৬)–এর স্প্লিট-স্ক্রিনের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে। এই দ্রুত সম্পাদনার ছন্দ শেষ হলে আমার ক্যামেরা আবার ভদ্রভাবে ফিরে যায় এফডিসিতে। পর্দায় লাল রঙের লেখাগুলো প্রশ্ন তোলে এফডিসি ভবনের ভেতরের নিদর্শনগুলোকে নিয়ে—জহির রায়হানের প্রতিকৃতি লাগানো সিঁড়ি, জংধরা রিল-টু-রিল মেশিন আর ইদানীং অল্প ব্যবহৃত সাউন্ড স্টেজ। এক অবসন্ন চলচ্চিত্রশিল্পের এই দৃশ্যগুলো মিলেমিশে ঘটায় এক নীরব সমালোচনা।
জহির রায়হানের আজীবন আইকন ভাঙার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই ধারা মিলে যায়। মনে পড়ে যায় জীবন থেকে নেয়ার শেষ দৃশ্যের সংলাপ, ‘এ দেশের প্রতি ঘর থেকে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, লোভ, লালসা, ঘৃণা, অবিচার ও অত্যাচারের ক্লেদ যেন চিরতরে মুছে দিতে পারি।’ স্বাধীনতার পর প্রায় ছয়টি দশক পার হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের শহীদের পক্ষে আমরা অনেক কথাই বলি, দাবি করি। তাঁরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?