‘বাস পার্ক’ করবে না বাংলাদেশ, বাটলারের চোখে চীনের বিপক্ষে লড়াইটা ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথের’
· Prothom Alo

এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মঞ্চে আগামীকাল মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সিডনির ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে শক্তিশালী চীনের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এই ম্যাচ সামনে রেখে আজ সিডনিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলার ও অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। এশিয়ান কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও ৯ বারের শিরোপাজয়ী চীনের বিপক্ষে এই লড়াই ঘিরে সিডনিতে প্রবাসী অনেকের মধ্যে বইছে রোমাঞ্চের হাওয়া।
Visit catcross.org for more information.
সংবাদ সম্মেলনে কোচ পিটার বাটলারকে অনেকটা নির্ভারই লেগেছে। গত কিছুদিনের সংবাদ সম্মেলনে যেমন রাগান্বিত থাকতেন, নানা অভাব-অভিযোগ নিয়ে বাফুফের বিরুদ্ধে তোপ দাগতেন, আজ তাঁর মেজার ছিল ভিন্ন। হাসি মুখে, ফুরফুরে মেজাজে উত্তর দিয়েছেন বেশ কটি প্রশ্নের।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের জন্য এই ম্যাচ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ফুটে উঠেছে বাটলারের কণ্ঠে। ম্যাচটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে এই ইংলিশ কোচ বলেন, ‘এটি সম্ভবত বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বা ঐতিহাসিক ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’ তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন কতটা শক্তিশালী, তা বাটলারের অজানা নয়। এই অসম লড়াইকে তিনি ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’–এর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা হলেও আকাশকুসুম কল্পনায় না ভুগে বাস্তবসম্মত থাকার ওপর জোর দিয়েছেন আফঈদাদের কোচ।
বাংলাদেশের কিছু ভালো খেলোয়াড় আছে, খাটো করে দেখছি না—ঋতুপর্ণাদের নিয়ে সতর্ক চীনের কোচবাস্তবতা বোঝাতে গিয়ে কোচ বাটলার একটু মজার স্বরে বলেন, ‘আমরা গুলিস্তানে ক্যাম্প করে এসেছি। এখন করছি অস্ট্রেলিয়ায়।’ দেশের ফুটবল মহলকে বারবার বাস্তবতা বোঝার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘বাস্তবতা বোঝার জন্য বলছি, যাতে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা না করা হয়। তবে সামর্থ্যের সেরাটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’ বাংলাদেশ ছাড়ার সময় প্রস্তুতি নিয়ে যে অসন্তোষ বা রাগ ছিল, সেটা এখনো আছে কি না, প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘আমি রাগ করি না। আমি বাস্তববাদী। প্রস্তুতিই সবকিছু। যদি ভালোভাবে প্রস্তুতি না নেওয়া যায়, ফলাফলের আশা না করাই ভালো। তবে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় এসে যা করেছি, তা যথেষ্ট।’
সাধারণত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা দলগুলো রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলে গোল হজম ঠেকাতে চায়, যাকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় ‘বাস পার্কিং’। কিন্তু বাটলারের দর্শন ভিন্ন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ রক্ষণাত্মক খোলসে বন্দী থাকবে না। তাঁর মতে, ‘ফলাফল যা–ই হোক, আমরা বাস পার্ক করার মতো দল নই। আমি চাই মেয়েরা মাঠে গিয়ে নিজেদের মেলে ধরুক এবং স্বাধীনভাবে ফুটবল খেলুক।’
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারগত বছরের জুলাইয়ে এশিয়ান কাপের টিকিট নিশ্চিত করার পর থাইল্যান্ডের বিপক্ষে হাইলাইন ডিফেন্সে খেলে ৫ গোল হজম করেছে বাংলাদেশ। এবার চীনের বিপক্ষে রক্ষণভাগ সাজানো নিয়ে বাটলার বলেন, ‘এমন দলের বিপক্ষে খেলতে হলে অবশ্যই রক্ষণ ঠিক রাখতে হবে। রক্ষণে ৩, ৪ না ৫ জন থাকবে, সেটা মাঠেই দেখা যাবে।’
বাটলার সরাসরি হাইলাইন ডিফেন্স নিয়ে কিছু না বললেও অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার অবশ্য বলেন, ‘আমরা এখানে বেশ কিছুদিন ধরেই অনুশীলন করছি। দিন দিন উন্নতি করছি। আমরা হাইলাইন ডিফেন্সেই খেলব, যা খেলেছি।’
চীনের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও কোনো মানসিক চাপে নেই বলে জানান অধিনায়ক। আত্মবিশ্বাসী আফঈদার কথা, ‘আমরা কোনো চাপ নিচ্ছি না। আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি, দেশের মানুষের জন্য খেলছি। আমরা এখানে এসেছি খেলাটি উপভোগ করতে।’ প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা নিয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘মাঠে নামলে আমরা তাদের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখব না, বরং আমাদের নিজেদের খেলাটা খেলব এবং সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
অনুশীলনে বাংলাদেশের মেয়েরাঅস্ট্রেলিয়ার উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রশংসা করে আফঈদা দেশের ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে আমরা ভালো সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণের মাঠ পেয়েছি। আমরা পুরোপুরি উপভোগ করছি। চীনের বিপক্ষে খেলার জন্য মাঠে আমাদের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করব। বাংলাদেশ যদি ভালো সুবিধা ও পরিবেশ দিতে পারে, তবে আমরা আরও ভালো খেলতে পারব। হ্যাঁ, আমাদের আশা ও বিশ্বাস আছে, ভবিষ্যতে সুবিধা ও পরিবেশ উন্নত পেলে আমরা আরও ভালো খেলব।’
চীনের বিপক্ষে নিজেদের সেরাটা দিতে চান বাংলাদেশের মেয়েরাচীনের বিপক্ষে গোল ব্যবধান কতটা সীমিত রাখা সম্ভব? এমন এক প্রশ্নের জবাবে কোচ বাটলার হার-জিতের ঊর্ধ্বে উঠে ম্যাচটিকে উপভোগ করতে বলেন, ‘জীবনে ছোট, ক্ষুদ্র জয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আমরা আমাদের খেলার আনন্দ ও কৌশল বজায় রাখব। জয় না হোক, আমরা টুর্নামেন্টকে সম্মান জানাব এবং সততার সঙ্গে খেলব।’
দেশবাসীর প্রত্যাশা নিয়ে বাটলারের বার্তা, ‘আমরা সততার সঙ্গে খেলব। আমরা ছোট হতে পারি, কিন্তু খেলোয়াড়দের হৃদয় বড়। তারা দেশের জন্য ভালো করতে চায়। আমরা কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে আছি, তবে আমরা আমাদের ফুটবল খেলব, মানুষের মন জয় করব এবং সততা ও বিনয় বজায় রাখব।’