ছফার ভিন্ন ভুবন
· Prothom Alo

একজন সংবেদনশীল ও মননশীল মনীষী এবং খানিকটা খ্যাপাটে লেখক আহমদ ছফার সঙ্গে আমার পরিচয় ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ ও ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ শিরোনামের দুটি দীর্ঘ প্রবন্ধের মাধ্যমে। এই দুটি লেখা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমার চিন্তাজগৎ তোলপাড় করেছিল। এরপর ধীরে ধীরে পড়েছি যদ্যপি আমার গুরু, গাভী বিত্তান্ত ও পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণ–এর মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। এ ছাড়া সাংবাদিক ভাষ্যকার হিসেবে বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখা তাঁর সাহসী, সুদূরপ্রসারী ও ক্ষুরধার লেখনীও আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে আহমদ ছফাকে বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খান। তাঁর মাধ্যমে আহমদ ছফা সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ তৈরি হয়।
Visit forestarrow.help for more information.
সেই আকাঙ্ক্ষা কিছুটা পূরণ হলো প্রথমা প্রকাশনের নতুন বই আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখির মাধ্যমে। মাত্র ১৭৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ আহমদ ছফার জীবনী নয়। এটি মূলত ছফার লেখা বা সাহিত্যকর্মের বিবরণ। সঙ্গে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আহমদ ছফার কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকথাও স্থান পেয়েছে গ্রন্থটিতে। বলা যায়, এই স্মৃতিগল্পগুলো গ্রন্থটিকে জীবন্ত ও সুপাঠ্য করেছে, কাজ করেছে সূত্রধরের।
মহিউদ্দিন আহমদ লিখছেন, কারও চোখে তিনি শয়তান, কারও চোখে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। দুটোই চরম।… [ছফা] অন্যের প্রশংসা পছন্দ করতেন, সমালোচনার ভার সইতে পারতেন না। তাঁর মধ্যে অন্যের প্রতি দরদ ও অ্যালার্জি—দুই-ই ছিল। ছিল ভালোবাসা ও ঘৃণা।
বর্তমান সময়ে অনেকে ছফা বলতেই পাগল, মন্ত্রমুগ্ধ, একান্ত অনুসারী। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এই দলে নন। তিনি রক্তে–মাংসে গড়া, দোষে-গুণের আহমদ ছফাকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। মহিউদ্দিন আহমদ লিখছেন, কারও চোখে তিনি শয়তান, কারও চোখে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। দুটোই চরম।… [ছফা] অন্যের প্রশংসা পছন্দ করতেন, সমালোচনার ভার সইতে পারতেন না। তাঁর মধ্যে অন্যের প্রতি দরদ ও অ্যালার্জি—দুই-ই ছিল। ছিল ভালোবাসা ও ঘৃণা। (পৃষ্ঠা: ৯-১০)
আহমদ ছফা : আমার কথা কইবে পাখি
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
মূল্য: ৪৫০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১৭৬
বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন
ভূমিকা বাদে গ্রন্থটিতে ৩৯টি অধ্যায় আছে। প্রতিটি আলোচনায় আছে লেখকের স্মৃতি আর অনন্য বিশ্লেষণ। আহমদ ছফার সঙ্গে লেখকের প্রথম দেখা দৈনিক গণকণ্ঠ অফিসে। এখানে উল্লেখ করা ভালো, আজীবন অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করা আহমদ ছফার একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পেশা ছিল এই গণকণ্ঠর চাকরি। সহকারী সম্পাদক হিসেবে কবি আল মাহমুদের গণকণ্ঠে তিনি জীবনের একমাত্র চাকরিটি করেছেন।
এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক ঘটনা, চরিত্র সম্পর্কে আহমদ ছফার মূল্যায়ন ও ভাবনা লেখক তুলে ধরেছেন গ্রন্থটিতে। এখানে ছোট্ট করে হলেও আলোচনা আছে, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এমনকি তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে। হ্যাঁ, অবশ্যই এই আলোচনায় আছে লেখকের স্মৃতিতর্পণ। এই গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় লেখক উল্লেখ করেছেন আহমদ ছফা সহজপাঠ্য কোনো চরিত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, কিছু ক্ষেত্রে খামখেয়ালি, কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই অনির্ণেয়, যাকে আমরা ইংরেজিতে বলি আনপ্রেডিক্টেবল। আহমদ ছফার এমনই এক অনির্ণেয় বা কিছুটা রহস্যজনক বিষয় ছিল লিবিয়া সংযোগ। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির লিবিয়ার প্রতি ছফার অনুরাগ ছিল, যোগাযোগ ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গাদ্দাফির রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক গ্রন্থ দ্য গ্রিন বুক বা কিতাবুল আখদার বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে আরব জাতীয়তাবাদ, ইসলাম ও সমাজতন্ত্রের ওপর লেখা মুয়াম্মার গাদ্দাফির এই গ্রন্থ ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়, যা পরে দেশটির কার্যত সংবিধানে রূপ নিয়েছিল। গ্রন্থে লিবিয়া নামের অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে আলোচনা আছে। তবে এই আলোচনা আরও দীর্ঘ হতে পারত।
আহমদ ছফার ...অনির্ণেয় বা কিছুটা রহস্যজনক বিষয় ছিল লিবিয়া সংযোগ। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির লিবিয়ার প্রতি ছফার অনুরাগ ছিল, যোগাযোগ ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গাদ্দাফির রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক গ্রন্থ দ্য গ্রিন বুক বা কিতাবুল আখদার বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন।
তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে আলোচনাটা আগ্রহ উদ্দীপক। যদিও এখানে আক্রমণ প্রবল। ব্যক্তি ছফা তসলিমা নাসরিনকে আক্রমণ করেছেন তীব্রভাবে। যেটা কারও কাছে যৌক্তিক বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হতে পারে। আমার ধারণা, পাঠক এই অংশে একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট পাবেন।
মাওলানা ভাসানী, ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অনুচ্ছেদগুলো খুবই ছোট। এগুলো আরও বড় হতে পারত। আর যেহেতু শুরুতে লেখক বলেছেন গ্রন্থটি জীবনীগ্রন্থ নয়, সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন; তাই এই অংশে ‘ছফার শেখ মুজিবুর রহমান’ ও ‘তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান’ নিবন্ধ দুটি নিয়ে আলাপ হতে পারত। লেখক কেন এই দুটি লেখা এড়িয়ে গেলেন, তা বোধগম্য নয়।
মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ মরে মরে সভ্যতা তৈরি হয়বইটির প্রচ্ছদটি অনেকের নজর কাড়তে পারে। বাংলা সাহিত্যে আহমদ ছফা ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্র। তিনি না ছিলেন গৃহী, না সন্ন্যাসী। জীবনাচার ও লেখাজোখায় অনেক সময় তাঁকে মনে হতো গ্রামবাংলার মেঠো পথে হেঁটে চলা এক দেশান্তরি বাউল। কলমের বদলে বাঁশি হাতে লেখক আহমদ ছফার এই প্রচ্ছদ সত্যিই অতুলনীয়। প্রচ্ছদশিল্পী মাসুক হেলাল একটি বিশেষ ধন্যবাদ পেতেই পারেন।