এমন অপমানজনক অপসারণ কি গভর্নরের প্রাপ্য ছিল

· Prothom Alo

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. আহসান এইচ মনসুর। আইএমএফের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদের এই কর্মকর্তাকে গভর্নর পদে নিয়োগ সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিল।

Visit fish-roadgame.online for more information.

ওই সময় বড় বিপর্যয়ের গিরিখাতে অর্থনীতির পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষত ফাইন্যান্সিয়াল (আর্থিক) খাত প্রায় ‘মেল্টডাউনের’ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৩ সালের আগস্টে যেখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল, সেখান থেকে বেধড়ক লুটপাটের শিকার হয়ে বিপজ্জনকভাবে কমতে কমতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। ডলারের বাজারদর ২০২২ সালে যেখানে ছিল এক ডলার সমান ৮৭ টাকা, সেখান থেকে দ্রুত ডেপ্রিসিয়েশনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক ডলারের দাম দাঁড়িয়েছিল ১২৫ টাকা। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল।

একজন অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর কখন ভালো, কেন খারাপ

দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও এই ১১টি পতনোন্মুখ ব্যাংকের অন্যতম ছিল। কারণ, এই ব্যাংকসহ দেশের সাতটি ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা এস আলমের হাতে।

পরবর্তী সময়ে সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে এস আলম এই সাত ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত হাজির করে দাবি করেছে যে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খেয়ালখুশি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারন’–এ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের কাজ কি শুধু ভাইভা নেওয়া

ব্যাংক লুটেরা এস আলম কর্তৃক লুণ্ঠিত সাতটি ব্যাংক হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক।

একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানত রাজনৈতিকভাবে জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ছিল। ওই সময় ওটা ছিল দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যাংক। দেশে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ রকম একটা শক্তিশালী ব্যাংককে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও মদদে।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাত বছরে এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক থেকে লুট করে নিয়ে গেছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানার প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণ রেখে গেছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন ড. মনসুর।

মব তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টাকে বের করে দেয় একদল কর্মকর্তা। এ সময়ের মধ্যে গভর্নরের রদবদলের খবরও ছড়িয়ে পড়ে।

আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করার পর গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও খেলাপি ঋণ সমস্যার কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বরং এখন আগের মতো খেলাপি লুকিয়ে ফেলার অপতৎপরতা আর না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ক্লাসিফায়েড লোনের অনুপাত বাড়তে বাড়তে এখন ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

খেলাপি ঋণের এই ৩৬ শতাংশ অনুপাত শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নয়, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ। আরও গুরুতর হলো বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এসব সত্ত্বেও ড. আহসান মনসুর গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যস্ত অবস্থাকে অনেকখানি সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছেন।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ডলারের বাজারদর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে।

আমার দুঃখ হচ্ছে, প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জনকারী গভর্নর ড. মনসুরকে তাঁর চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছরের বেশি থাকার পরও বিদায় নিতে হলো। তার চেয়েও বড় কথা তাঁর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে।

দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকও কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার ১৮ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে।

ঋণের সুদহার কমানোর জন্য প্রবল চাপ থাকলেও ড. মনসুর মূল্যস্ফীতির হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের স্বার্থে ওই চাপে নতি স্বীকার করেননি। দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২০২৫ সালে ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে বলে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের চলতি অ্যাকাউন্টে শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ তিন বছর ধরে সৃষ্টি হওয়া মারাত্মক ঘাটতি অবস্থার পরিবর্তে ২০২৬ সালে আবারও উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের বিপজ্জনক ঘাটতি পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে দেশের আর্থিক খাত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার লুটপাটতন্ত্র কাটিয়ে গত দেড় বছরে আবার স্থিতিশীল অবস্থায় উপনীত হয়েছে। যদিও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো খুবই নাজুক অবস্থায় রয়ে গেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতা গেড়ে বসে রয়েছে।

ব্যাংক খাতে ‘লাইসেন্স টু লুট’, বাংলাদেশ সংস্করণ

আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকারও দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু উদ্যোগ কার্যকর হতে দেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধির জন্য প্রণীত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনী প্রস্তাবটি অন্তর্বর্তী সরকার আটকে দিয়েছে।

একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের এই অযৌক্তিক অবস্থানের কারণে দেশ একটি বিশাল সুযোগ হারিয়েছে। খেলাপি ব্যাংকঋণ সংকটটির সমাধানের কিছু যুক্তিগ্রাহ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. মনসুর, সেগুলোও গ্রহণ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া সব নীতিনির্ধারকের মধ্যে সচেতন জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছিলেন গভর্নর ড. আহসান মনসুর।

আমার দুঃখ হচ্ছে, প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জনকারী গভর্নর ড. মনসুরকে তাঁর চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছরের বেশি থাকার পরও বিদায় নিতে হলো। তার চেয়েও বড় কথা তাঁর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে।

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল

ড. মনসুর বুধবার দুপুরে যখন সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তখনো তাঁকে জানানো হয়নি যে তাঁর অপসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সাংবাদিকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন ত্যাগ করার পর বিকেল চারটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশ-বিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়।

নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার তাদের পছন্দসই ব্যক্তিদের সরকারের বিভিন্ন পদে বসাবে, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু ড. মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির বিপর্যয় যেভাবে সফলভাবে মোকাবিলা করেছে, তাঁকে এমন অপমানজনকভাবে অপসারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করলে ব্যাপারটি নিন্দনীয় হতো না।

  • ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source