নারীদের আয়ের পথ দেখিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন দিলারা
· Prothom Alo
পুটিমারী গ্রামে একসময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাল্যবিবাহ, যৌতুক নিয়ে ঝগড়া, ঋণের চাপ, ভাঙা সংসার—এসবই ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। সেই গ্রামে এখন উঠানে বসে পাটের ব্যাগ, পাপোশ, ঝুড়িসহ নানা পণ্য তৈরি করেন নারীরা। মাসে আয় করেন সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। সন্তান যাচ্ছে স্কুলে। ঘরে ফিরেছে সচ্ছলতা।
Visit librea.one for more information.
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পুটিমারী গ্রামে এই পরিবর্তনের পেছনে আছেন একজন নারী। নাম দিলারা বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির গ্রামে গিয়ে দারিদ্র্য আর নারী নির্যাতনের চিত্র দেখে দিলারা বেগম ভেবেছিলেন, নারীরা আয় না করলে সংসারের অভাব ঘুচবে না। সেই ভাবনা থেকে গড়েন সমিতি। নারীদের হাতে তুলে দেন হাঁস–মুরগি। শেখান সঞ্চয়। পরে যুক্ত করেন পাটের নকশা আর হস্তশিল্প। এসব পণ্য দেশীয় বাজার ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। পাশাপাশি সমিতির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, বাল্যবিবাহ ও যৌতুকবিরোধী প্রচারও চালানো হচ্ছে। মিঠাপুকুরের সাতটি গ্রামের পাঁচ শতাধিক নারীর চোখে আজ যে স্বপ্নের আলো, তার নেপথ্যের কারিগর ‘দিলারা আপা’।
দিলারা বেগম দুস্থ নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে অবদান রাখায় ২০২৪ সালে উপজেলার সেরা উদ্যোক্তা হিসেবে দিলারা বেগমকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নারী নির্যাতন নাড়া দেয় দিলারাকে
দিলারা বেগমের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরের ফরিদপুর গ্রামে। ২০০০ সালে তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা আবদুল হক ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। পরে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এর মধ্যে ২০০০ সালের জুনে বিয়ে হয় পাশের পুটিমারী গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। হাফিজুরদের আছে ১০ বিঘা জমিও।
বিয়ের পর দিলারা দেখেন, পুটিমারী গ্রামের মানুষ দরিদ্র্য। যৌতুকের জন্য প্রায়ই ঘটত নারী নির্যাতন ও বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। ঝগড়া-বিবাদও লেগে ছিল। এই চিত্র দিলারাকে নাড়া দেয়। তিনি ভাবেন, নারীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলে সংসারে অভাব লেগেই থাকবে। সেই ভাবনা থেকেই কিছু একটা করার কথা ভাবেন তিনি।
এখন পুটিমারীর পাশাপাশি বালারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, নানকর, বাতিয়া, গয়েশপুর গ্রামের প্রায় ৬০০ দরিদ্র পরিবারের নারী শিকা, ব্যাগ, ডগবেড, ক্যাটবেড, ওয়ালমেট, ঝুড়ি, পাপোশ তৈরি করে মাসে ৬–৭ হাজার টাকা আয় করছেন।
২০১১ সালে গ্রামের স্বামীহারা মমেনা খাতুনকে মুড়ির ব্যবসা করার জন্য তিন হাজার টাকা দেন দিলারা। বদলে যায় মমেনার সংসারের চেহারা। এ কথা শুনে স্বামী হাফিজুর রহমান উৎসাহ দেন। গ্রামের অভাবগ্রস্ত পরিবারের নারীদের সংগঠিত করে সমিতি গঠনের পরামর্শ দেন। দিলারা জানান, তাঁর স্বামীর অনুপ্রেরণায় গ্রামের নারীদের বোঝানো শুরু করেন।
৭৫ হাজার টাকায় সমিতির শুরু
২০১২ সালে ৪৫ জন নারীকে নিয়ে গঠিত হয় পুটিমারী মহিলা উন্নয়ন সমিতি। দিলারা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে প্রত্যেক সদস্যকে দুটি করে হাঁস ও মুরগি কিনে দেন। হাঁস-মুরগি ডিম দেওয়া শুরু করলে দিলারা সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় নেওয়া শুরু করেন। প্রত্যেক সদস্য সপ্তাহে ৭০ টাকা করে দিতে থাকেন। ৩ বছরে সঞ্চয় আর বিনিয়োগ করে তহবিলে জমা হয় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যা সদস্যরা ভাগ করে নেন। ওই টাকা দিয়ে তাঁরা কেউ আবার হাঁস-মুরগি, কেউ গরু-ছাগল কিনে পালন শুরু করেন।
সমিতির এই সাফল্য আত্মবিশ্বাসী করে দিলারাকে। তাঁর এসব কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বজন ও এলাকার লোকজন এগিয়ে আসেন। ২০১৬ একটি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় সমিতির ৫০ জন নারীকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সেলাই মেশিন কিনে দেওয়া হয়। বদলে যেতে থাকে তাঁদের সংসারের মলিন চেহারা।
পুটিমারীর পণ্য যাচ্ছে বিদেশে
দিলারার মনে আরও নতুন স্বপ্ন উঁকি দেয়। ২০১৭ সালের মে মাসে রংপুরের চারমাথা এলাকার বাসিন্দা রওশন আলমের কাছে দিলারা নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ শেখেন। প্রথমে পাট দিয়ে বাড়িতে নিজেই ১০টি পাপোশ তৈরি করেন। এতে খরচ হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অনলাইনে তিনি পাপোশ ১০টি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসায়ী রায়হান রাফির কাছে বিক্রি করে ৩ হাজার টাকা লাভ করেন। রায়হান রাফি দিলারাকে আরও ২২০ পিস পাপোশের ফরমাশ দেন। তখন ৫৫ জন নারীকে হস্তশিল্পের কাজ শেখান দিলারা। হস্তশিল্পের কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন নারীরা। এতে পাশের গ্রামের নারীদেরও অনুপ্রাণিত করে। তাঁরাও ভিড়তে থাকেন দিলারার কাছে।
প্রথমে নিজে নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ শেখেন দিলারা বেগম। এরপর অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেন। সম্প্রতি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পুটিমারী গ্রামেবিভিন্ন মেলায়ও দিলারা প্রদর্শনী আয়োজন করায় এসব পণ্য ব্যাপক সাড়া জাগায়। এখন পুটিমারীর পাশাপাশি বালারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, নানকর, বাতিয়া, গয়েশপুর গ্রামের প্রায় ৬০০ দরিদ্র পরিবারের নারী শিকা, ব্যাগ, ডগবেড, ক্যাটবেড, ওয়ালমেট, ঝুড়ি, পাপোশ তৈরি করে মাসে ৬–৭ হাজার টাকা আয় করছেন।
দিলারা জানান, ক্রেতারা নকশা পাঠিয়ে দিলারার মাধ্যমে এসব পণ্য তৈরি করিয়ে নিয়ে যান। ঢাকা, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য কিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছেন। চীন, তুরস্ক, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে নারীদের তৈরি এসব পণ্য। অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে। রংপুর শাপলা চত্বর এলাকায় দিলারা একটি শোরুম চালু করেছেন। নাম নাঈম হস্তশিল্প। প্রতিদিনই অনলাইনে ক্রেতারা দিলারার কাছ থেকে পণ্য কিনে নিচ্ছেন। মাসে ২০-২৫ লাখ টাকার পণ্য তিনি বিক্রি করেন। প্রতিটি পণ্যে ৫০ টাকা করে কমিশন পান।
মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য আমেনা বেগম বলেন, গ্রামে একসময় খুব ঝগড়া–বিবাদ হতো। অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে যেত গ্রামের মানুষ। কিন্তু এখন কলহ অনেক কমে গেছে। কারণ, মানুষ তো কাজেই ব্যস্ত, কলহ করার সময় নেই।
দিনবদলের গল্প
সম্প্রতি এক সকালে দিলারা বেগমের বাড়ি যাওয়ার পথে চোখে পড়ে, উঠানে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজে ব্যস্ত নারীরা। প্রতিটি বাড়ির উঠানের পাশে সবজি ও মসলার খেত। উঠানে হাঁস-মুরগি আর গরু-ছাগলের বিচরণ। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও রয়েছে। বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা।
দিলারার বাড়ির উঠানে একসঙ্গে ২৫–৩০ জন নারী কাজ করছেন। দিলারা তাঁদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। সমিতির ঘরেও কয়েকজন নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।
সাহিনা বেগমের জমি ছিল না। ১০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে তিন সদস্যের সংসার চালাতেন। সাহিনা জানালেন, হস্তশিল্পের কাজ করে মাসে ৯ হাজার টাকা আয় করছেন। এখন তাঁর বাড়িতে হাঁস-মুরগি ও গাভি আছে। ৩০ শতক জমি বন্ধক নিয়েছেন।
শফিকুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদ, মিঠাপুকুর, রংপুরনারীরা সচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি গ্রামে এসেছে স্বাস্থ্যসচেতনতা। গ্রামে বাল্যবিবাহ, যৌতুক দেওয়ার প্রবণতা কমেছে। বেড়েছে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ।গ্রামের এসমোতারা বেগমের স্বামী ময়নুল হক দুই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কর্মক্ষমতা হারান। হস্তশিল্পের কাজ করে এসমোতারা এখন সংসারের হাল ধরেছেন। একইভাবে নানকর গ্রামের সিদ্দিকা বেগম, মুরাদপুর গ্রামের মঞ্জিলা খাতুন, সোলেমা খাতুন আশরাফি খাতুন হস্তশিল্পের কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা আনার গল্প শোনালেন।
পুটিমারী গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী ময়না খাতুন জানান, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ করেন। এতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা উপার্জন হয়। নিজের আয়ে পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন, বাবার সংসারে করছেন সাহায্য।
অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়ায় দিলারার প্রশংসা করলেন উপজেলার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শাহানাজ ফারহানা। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর কাজের তৎপরতা দেখেছি। তাঁর কাজ প্রশংসার দাবিদার।’
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
শুধু আর্থিক বিষয়েই সমিতির সদস্যদের কার্যক্রম সীমিত নয়; নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন সমিতির সদস্যরা।
মিঠাপুকুর সদরে বড় একটি পোশাক কারখানা করার ইচ্ছা দিলারা বেগমের। যেখানে কাজ করবেন উপজেলার নারীরাসমিতির সদস্য মোসলেমা খাতুন বলেন, সমিতির ১০ জন নারী নিয়ে একটি দল আছে। এই দলের সদস্যরা শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া হয়েছে কি না, খোঁজ নেন। বসতভিটায় সবজি চাষের পরামর্শ দেন। এ ছাড়া গ্রামের বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ রোধের জন্য ৩০ সদস্যের একটি নারীর দল আছে। তারা চার বছরে গ্রামের পাঁচ শিশুকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করেছে।
দিলারা বেগমের পরামর্শে গ্রামের নারীরা তাঁদের জীবনমানের উন্নতি করতে পেরেছেন বলে মনে করেন মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নারীরা সচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি গ্রামে এসেছে স্বাস্থ্যসচেতনতা। গ্রামে বাল্যবিবাহ, যৌতুক দেওয়ার প্রবণতা কমেছে। বেড়েছে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ।
আরও বড় স্বপ্ন দিলারার
নিজের আয়ের টাকায় আবাদি জমি ও পাকা বাড়ি করেছেন দিলারা বেগম। হাঁস-মুরগি ও গাভি পালন করছেন। এক মেয়ে, এক ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার তাঁর।
দিলারা ২০২৩ সালের মে মাসে এন্টারপ্রেনিউর অ্যান্ড ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের (ইপি) আয়োজনে ইপি নক্ষত্র অ্যাওয়ার্ড পান। এ ছাড়া বাংলাদেশে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পে ২০২৩ সালের শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা পান।
দিলারার উদ্যোগের সঙ্গে আছেন স্বামী হাফিজুর রহমানের। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী দুস্থ নারীদের জন্য কিছু করছেন, এতে তাঁর যেমন ভালো লাগছে, তেমনি নিজেও লাভবান হচ্ছেন।
নারীদের জন্য আর কী করতে চান, এ প্রশ্নের জবাবে দিলারা মিষ্টি হেসে বলেন, ‘চাকরি করলে তো আমার ভাগ্যের উন্নয়ন হতো; কিন্তু এত নারীর ভাগ্য ঘুচত না। আমাকেও এত ভালোবাসত না। নারীরা যখন আমাকে আপা বলে ডাকে, তখন বুকটা ভরে যায়। এখন আমার একটাই স্বপ্ন, মিঠাপুকুর সদরে বড় একটি পোশাক কারখানা করব। পুরো উপজেলার নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা দেব। ধীরে ধীরে নারীদের হস্তশিল্প ও নকশার কাজে যুক্ত করব।’