সহিষ্ণু আয়ারল্যান্ডে রমজান মুসলিমজীবনের আবেগ, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির গল্প
· Prothom Alo

রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা, আইনের দৃঢ় শাসন, সামাজিক সহিষ্ণুতা ও পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আয়ারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বমঞ্চে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি বহন করে আসছে। মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি, ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের যে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ এখানে বিকশিত হয়েছে, তা ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ফলে এই দেশে বসবাসরত মুসলিমদের কাছে রমজান কেবল ধর্মীয় সাধনার সময় নয়; এটি আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের, সাংস্কৃতিক শিকড়কে দৃঢ় করার এবং সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক সহমর্মিতাকে আরও গভীর করার এক আবেগঘন ও তাৎপর্যময় অধ্যায়।
Visit milkshakeslot.lat for more information.
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত মুসলিমদের কাছে রমজান একদিকে যেমন ইবাদতের মাস, অন্যদিকে প্রবাসজীবনে সংস্কৃতি, পরিচয় ও সাম্প্রদায়িক বন্ধনের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সময়। ইউরোপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের এই দেশে মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও রমজান এলে নগরজীবনে এক স্বতন্ত্র আবহ সৃষ্টি হয়, যা ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রাজধানী ডাবলিনসহ বড় শহরগুলোর মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইবাদত, ইফতার আয়োজন, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রাণবন্ত মিলনমেলা, যা প্রবাসী মুসলিমদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
পবিত্র রমজানের সন্ধ্যায় কুয়েতের রান্নাঘরে ঐতিহ্যের ঘ্রাণপ্রবাসের রমজানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বহুজাতিক মুসলিম সমাজ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও স্থানীয় আইরিশ মুসলিম—সবাই মিলে তৈরি করেছে এক বৈচিত্র্যময় কমিউনিটি। ফলে ইফতার টেবিলেও দেখা যায় নানা সংস্কৃতির ছাপ। বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, খেজুর ও ফলের পাশাপাশি ভাত-তরকারি থাকে; আরব পরিবারগুলোতে স্যুপ, সাম্বুসা ও মাংসের পদ; আবার আফ্রিকান মুসলিমদের থাকে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার। এই বৈচিত্র্য প্রবাসের ইফতারকে একধরনের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
আয়ারল্যান্ডে কর্মজীবী মুসলিমরা অফিস, হাসপাতাল, ট্যাক্সি চালানো বা অন্য পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেও রোজা পালন করেন। অনেকেই দুপুরের বিরতিতে নামাজ পড়েন বা কোরআন তিলাওয়াত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও রমজানকে ঘিরে আলাদা উচ্ছ্বাস দেখা যায়; বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মুসলিম সোসাইটি ইফতার আয়োজন করে, যেখানে অমুসলিম বন্ধুরাও অংশ নেয়।
আয়ারল্যান্ডে রোজার সময়সূচি বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। বছরের কোন সময়ে রমজান পড়ছে, তার ওপর নির্ভর করে রোজার দৈর্ঘ্য বদলে যায়। শীত বা বসন্তে রোজা তুলনামূলক ছোট হলেও গ্রীষ্মে কখনো কখনো দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হয়। কর্মজীবী মুসলিমরা অফিস, হাসপাতাল, ট্যাক্সি চালানো বা অন্য পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেও রোজা পালন করেন। অনেকেই দুপুরের বিরতিতে নামাজ পড়েন বা কোরআন তিলাওয়াত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও রমজানকে ঘিরে আলাদা উচ্ছ্বাস দেখা যায়; বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মুসলিম সোসাইটি ইফতার আয়োজন করে, যেখানে অমুসলিম বন্ধুরাও অংশ নেয়। চলতি বছর ২০২৬ সালে রমজান শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে।
রমজান এলে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের মসজিদগুলোতে বিশেষ প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ডাবলিন, করক, লিমেরিক, ওয়াটারফোর্ড, গলওয়ে, কিলকেনি, কিলারনি, কেরি ,লেটারকেনি, টিপারারি, পোর্টলিশ, কারলোসহ বিভিন্ন শহরের মসজিদে রমজান উপলক্ষে মুসল্লিরা ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। এসব মসজিদে নিয়মিত তারাবিহর নামাজ আদায় করা হয়। ডাবলিনের ক্লনস্কি এলাকায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই আবার চালু হওয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখানে তারাবিহ নামাজ, জামাতে নামাজ, ধর্মীয় আলোচনা ও কমিউনিটি ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিম প্রতিবেশীরাও অংশ নেন, যা আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
প্রবাসজীবনের একটি আবেগঘন দিক হলো দেশের স্মৃতি। পরিবারের সঙ্গে ইফতার, মসজিদের মাইকে আজান, রাস্তার ইফতারি বাজার—এসবের অভাব প্রবাসীদের মনে নাড়া দেয়। তবে প্রযুক্তি দূরত্ব কিছুটা কমিয়েছে; ভিডিও কলে পরিবার নিয়ে একসঙ্গে ইফতার করার দৃশ্য এখন খুব পরিচিত। প্রবাসে জন্ম নেওয়া মুসলিম শিশুদের জন্যও রমজান একটি পরিচয় শেখার সময়। স্কুলে বন্ধুদের প্রশ্ন, রোজা রাখার অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে শিশুদের সংযোগ তৈরি হয় এই মাসে।
আয়ারল্যান্ডে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় সংগঠন অল বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। গত বছরের নভেম্বরে নির্বাচনে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে মো. মোস্তফা এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আনোয়ারুল হক আনোয়ার নির্বাচিত হন। এসব সংগঠন রমজান মাসে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। এ সময় অনেকেই ব্যস্ততার মধ্যেও প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করেন।
তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশন আয়ারল্যান্ড একটি স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সামাজিক সংগঠন, যা বিশেষ করে ডাবলিনে কমিউনিটি সাপোর্ট, গৃহহীনদের সহায়তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সাগর আহমদ শামীম একজন বাংলাদেশি, যিনি তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে বাংলাদেশিদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। পবিত্র রমজান মাসে সংস্থাটি ডাবলিন শহরের রোজাদার, গৃহহীন মানুষ, আশ্রয়প্রার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ইসলামিক রিলিফ এবং কিনারা রেস্তোরাঁর সহযোগিতায় ইফতার বিতরণ করে থাকে। উল্লেখযোগ্যভাবে সাধারণ কার্যক্রম হিসেবে প্রায় ১০ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার চার শতাধিক মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এই সংগঠন। এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সুহাদা ফাউন্ডেশন রমজান মাসে বৃহৎ পরিসরে ইফতারি বিতরণ করে মানবিক অবদান রেখে চলেছে।
আয়ারল্যান্ডে মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা প্রবাসী প্রজন্মের পরিচয় ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডাবলিনে রাষ্ট্র–স্বীকৃত মুসলিম ন্যাশনাল স্কুলসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি কোরআন শিক্ষা ও ইসলামিক স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে সপ্তাহান্তভিত্তিক কোরআন শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্লাস পরিচালিত হয়, যেখানে প্রবাসী মুসলিম পরিবারের শিশুরা আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশের মতো পূর্ণাঙ্গ আবাসিক মাদ্রাসা ব্যবস্থা এখানে না থাকলেও ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক চর্চা বজায় রাখতে এসব উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে রমজান এলে এসব প্রতিষ্ঠান ও সেন্টারগুলোতে ভিন্ন এক আবহ তৈরি হয়। ইফতার আয়োজন, কোরআন তিলাওয়াত, নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে, যা প্রবাসজীবনের মধ্যেও আধ্যাত্মিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে।
আয়ারল্যান্ডের মূলধারার গণমাধ্যমেও রমজান এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটি (আরটি) এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৬ সালে রমজান শুরু হয়েছে খ্রিষ্টানদের লেন্টের সময়ের কাছাকাছি, যা ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ মিলনমুহূর্ত। একইভাবে প্রভাবশালী দৈনিক দ্য আইরিশ টাইমস রমজানের সূচনা, মুসলিমদের রোজার সময়সূচি ও সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব সংবাদ থেকে বোঝা যায়, মুসলিমদের ধর্মীয় জীবন এখন আয়ারল্যান্ডের বৃহত্তর সমাজেও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠছে।
রমজানের শেষ দশক ঘনিয়ে এলে ঈদের প্রস্তুতিও শুরু হয়। নতুন পোশাক কেনা, ঈদের নামাজের আয়োজন, ছুটি নেওয়ার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে প্রবাসে ঈদও এক বিশেষ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। দেশের বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট শহরের কমিউনিটি সেন্টার ও মসজিদগুলোতে ঈদের জামাতে মুসল্লিরা সমবেত হন। যদিও দেশের মতো কোলাহল নেই, তবু কমিউনিটির ভেতরে ভাগাভাগি আনন্দই এখানে বড় ঈদের শক্তি। উল্লেখযোগ্যভাবে আয়ারল্যান্ডে এবার প্রথমবারের মতো আইরিশ রিটেইল ব্র্যান্ড পেনেইজের বিভিন্ন স্টোরে এথনিক কালেকশনে পুরুষদের পাঞ্জাবি ও পায়জামা দেখা যাচ্ছে, যা বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রবাসের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আয়ারল্যান্ডে মুসলিমদের রমজান আন্তরিকতা, সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক বন্ধনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও নিজের ধর্মীয় অনুশাসন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসাকে ধরে রাখার এ প্রচেষ্টাই প্রবাসজীবনের রমজানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। এই আন্তরিকতার মধ্যেই তৈরি হয় একধরনের মানসিক শক্তি, যা প্রবাসীদের কাছে রমজানকে শুধু ইবাদতের মাস নয়, বরং পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মিক বন্ধনের এক গভীর অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।