এই তরুণী জীবনের খুঁটিনাটি সব স্মৃতি মনে করতে পারেন, তবে সমস্যাও আছে

· Prothom Alo

২০১০ সালে বলিউডে মুক্তি পায় ‘রোবট’ নামের একটি সিনেমা। সেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন সাবেক বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই ও দক্ষিণ ভারতীয় সুপারস্টার রজনীকান্ত। ‘চিট্টি’ নামের এক রোবটের ভূমিকায় অভিনয় করেন রজনীকান্ত। চিট্টি সব মনে রাখতে পারে। কখনোই কিছু ভোলে না। যেকোনো বই একবার পড়লেই কোন পৃষ্ঠায় কী আছে, তা অবলীলায় বলে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, চিট্টির মতো রক্তমাংসের মানুষও আছে! এ ধরনের মানুষকে কেউ হয়তো বলবেন ‘বিরল রোগে আক্রান্ত’, আবার বলা যেতে পারে ‘অসাধারণ প্রতিভাবান’, ‘বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট’ বা ‘অত্যন্ত সৌভাগ্যবান’। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ‘কন্ডিশন’ বা শারীরিক পরিস্থিতিটির নাম হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি (এইচএসএএম) বা হাইপারথাইমেসিয়া। হাইপারথাইমেসটিক সিনড্রোমও বলা হয় একে।

কানাডীয় তরুণী এমিলি ন্যাশ বিরল হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরির (এইচএসএএম) জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান ২০২৪ সালে

হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি (এইচএসএএম) কী?

শারীরিক পরিস্থিতিটি অত্যন্ত বিরল এক ক্ষমতাও বটে। এতে কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনের প্রতিটি দিনের ঘটনা, তারিখ, সময়, অনুভূতি, আবহাওয়া, খবর বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নির্ভুলভাবে মনে রাখতে পারেন।

Visit sports24.club for more information.

জীবনের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বললে, সেই দিনের প্রতিটি ঘটনা নিখুঁত ও বিস্তারিত মনে করতে পারেন তাঁরা। কী ঘটেছিল, কী পরেছিলেন, কী অনুভব করেছিলেন—সবকিছু স্পষ্টভাবে মনে থাকে।

তবে এটি সাধারণ ভালো স্মৃতিশক্তির মতো নয়; এটি মূলত ব্যক্তিগত ও আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকেন্দ্রিক ক্ষমতা। ২০২১ সালের এক হিসাবে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ১০০ জনের মধ্যে এই ক্ষমতা শনাক্ত করা গেছে। এই পরিস্থিতি যাঁর মধ্যে আছে, তাঁকে বলা হয় ‘হাইপারথাইমেসিয়াক’।

হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা জীবনের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বললে, সেই দিনের প্রতিটি ঘটনা নিখুঁত ও বিস্তারিত বলতে পারেন

ধারণা করা হয়, সারা বিশ্বের ৮০০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৬০ থেকে ১০০ জন এই ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন। অর্থাৎ বিশ্বে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে আট কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র একজন এইচএসএএম আক্রান্ত হতে পারেন। তাঁদের মধ্যে এমিলি ন্যাশ বয়সে সবার ছোট।

এই ক্ষমতা থাকা মানেই সব বিষয়ে জিনিয়াস হওয়া নয়। তবে এখন পর্যন্ত এই পরিস্থিতি যাঁদের মধ্যে আছে, তাঁদের সবাই যা কিছু একবার পড়েন বা দেখেন, তার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মনে রাখতে পারেন। অনেক সময় এটি মানসিকভাবে ভীষণ রকম চাপও তৈরি করতে পারে। কারণ, খারাপ স্মৃতিও তাঁদের জন্য ভুলে যাওয়া কঠিন।

এসব ছোট ছোট কৌশল আপনার স্মৃতিশক্তি বাড়াবে

বিরল ক্ষমতার অধিকারী এমিলি ন্যাশ

এমিলি ন্যাশ কানাডীয় তরুণী। বিরল ক্ষমতাটির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান ২০২৪ সালে। সে বছর ১৮ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার ‘নাইন নেটওয়ার্ক চ্যানেল’–এর জনপ্রিয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতামূলক টক শো ‘সিক্সটি মিনিটস’–এ অতিথি হয়ে আসেন এমিলি।

সাংবাদিক তারা ব্রাউনের প্রশ্নের উত্তরে এমিলি বলেন, ‘আমার মস্তিষ্ক অনেকটা ক্যালেন্ডারের মতো। আমি চাইলে পেছনে গিয়ে যেকোনো দিনে ঢুঁ মারতে পারি। তখন সেই দিনের সব ঘটনার বিস্তারিত আমার মাথার ভেতর ছবির মতো ফুটে ওঠে। সব স্পষ্ট দেখতে পাই।’

তারা ব্রাউন পরীক্ষা করার জন্য বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। এমিলি প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন।

এমিলি ন্যাশ বলেন, ‘আমার মস্তিষ্ক অনেকটা ক্যালেন্ডারের মতো।’

‘সিক্সটি মিনিটস’–এর ইনস্টাগ্রামে হ্যান্ডলে এমিলির সাক্ষাৎকারের ছোট ভিডিওর নিচে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমি তো বাজারে গিয়ে অন্য অনেক কিছু কিনে আনি। কিন্তু বাসায় আসার পর দেখা যায়, যেটা কিনতে গিয়েছিলাম, সেটাই কেনা হয়নি!’

আরেকজন লিখেছেন, ‘ঝগড়া করার সময় আমার স্ত্রীর ওপর এইচএসএএম ভর করে।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘বাহ্‌, পরীক্ষা নিয়ে কোনো টেনশনই নেই। সব বিষয়ে শতকরা ৯০ ভাগ নম্বর!’

অভিনেত্রী স্পর্শিয়ার বিরল রোগ অ্যামেলোব্লাস্টোমার উপসর্গ কী, চিকিৎসা কতটা জটিল

এমিলি ন্যাশের মতো আরও তিনজন

জিল প্রাইস: ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম। এইচএসএএম নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণার প্রথম শনাক্ত ব্যক্তি। তিনি জীবনের প্রায় প্রতিটি দিনের ঘটনা তারিখসহ মনে রাখতে পারেন। তাঁর ওপর ভিত্তি করেই এইচএসএএম নিয়ে আধুনিক গবেষণা শুরু হয়। জিল প্রাইস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াসংশ্লিষ্ট প্রশাসন বিভাগে কর্মরত।

বেকি শ্যারক: অস্ট্রেলিয়ার এই নারী একেবারে শৈশবের স্মৃতিও স্পষ্ট মনে করতে পারেন। তিনি দাবি করেন, এক বছর বয়সের আগের ঘটনাও তাঁর মনে আছে। বেকির জন্ম ১৯৯০ সালের মার্চে। তাঁকে নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় গবেষণা চলমান।

ব্র্যাড উইলিয়ামস: কোনো তারিখ বললে তিনি সেদিনের খবর, ব্যক্তিগত ঘটনা এবং ঐতিহাসিক তথ্য একসঙ্গে বলতে পারেন। তাঁকে নিয়েও গবেষণা চলছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়।

কিছু কথা

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এইচএসএএম–এ লুকিয়ে আছে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারস ডিজিজের অজানা রহস্য

স্বাভাবিকভাবেই হাইপারথাইমেসিয়াকদের ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত গোপন রাখা হয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের স্বাভাবিকতা যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য কেউ কেউ নিজের এই ক্ষমতার কথা কখনোই প্রকাশ করেন না। কেননা সারা বিশ্বই তাঁদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী।

এমনকি তাঁদের ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কাজ বা অপরাধ ঘটানোও কঠিন নয়। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে ও গবেষণা চলমান থাকায় তাঁদের ব্যক্তিগত এবং এই রোগের বিস্তারিত নানা দিক নিয়ে খুব বেশি জানার সুযোগ থাকে না।

সূত্র: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ

ঘরে থাকতে ভালোবাসেন? এর পেছনের মনোবিজ্ঞান আপনাকে অবাক করবে

Read full story at source